Saturday, December 31, 2011

অ-নামিকা

  কাজী নজরুল ইসলাম

তোমারে বন্দনা করি
স্বপ্ন-সহচরী
লো আমার অনাগত প্রিয়া,
আমার পাওয়ার বুকে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া!
তোমারে বন্দনা করি….
হে আমার মানস-রঙ্গিণী,
অনন্ত-যৌবনা বালা, চিরন্তন বাসনা-সঙ্গিনী!
তোমারে বন্দনা করি….
নাম-নাহি-জানা ওগো আজো-নাহি-আসা!
আমার বন্দনা লহ, লহ ভালবাসা….
গোপণ-চারিণী মোর, লো চির-প্রেয়সী!
সৃষ্টি-দিন হ’তে কাঁদ’ বাসনার অন্তরালে বসি’-
ধরা নাহি দিলে দেহে।
তোমার কল্যাণ-দীপ জ্বলিলে না
দীপ-নেভা বেড়া-দেওয়া গেহে।
অসীমা! এলে না তুমি সীমারেখা-পারে!
স্বপনে পাইয়া তোমা’ স্বপনে হারাই বারে বারে
অরুপা লো! রহি হ’য়ে এলে মনে,
সতী হ’য়ে এলে না ক’ ঘরে।
প্রিয় হ’য়ে এলে প্রেমে,
বধূ হয়ে এলে না অধরে!
দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্‌ শরাব,
পেয়ালায় নাহি এলে!-
‘উতারো নেকার’-
হাঁকে মোর দুরন্ত কামনা!
সুদুরিকা! দূরে থাক’-ভালোবাসা-নিকটে এসো না।

তুমি নহ নিভে যাওয়া আলো, নহ শিখা।
তুমি মরীচিকা,
তুমি জ্যোতি।-
জন্ম-জন্মান্তর ধরি’ লোকে-লোকান্তরে তোমা’ করেছি আরতি,
বারে বারে একই জন্মে শতবার করি!
যেখানে দেখেছি রূপ,-করেছি বন্দনা প্রিয়া তোমারেই স্মরি’।
রূপে রূপে, অপরূপা, খুঁজেছি তোমায়,
পবনের যবনিকা যত তুলি তত বেড়ে যায়!
বিরহের কান্না-ধোওয়া তৃপ্ত হিয়া ভরি’
বারে বারে উদিয়াছ ইন্দ্রধনুসমা,
হাওয়া-পরী
প্রিয় মনোরমা!
ধরিতে গিয়োছি-তুমি মিলায়েছ দূর দিগ্বলয়ে
ব্যথা-দেওয়া রাণী মোর, এলে না ক’ কথা কওয়া হ’য়ে।

চির-দূরে থাকা ওগো চির-নাহি-আসা!
তোমারে দেহের তীরে পাবার দুরাশা
গ্রহ হ’তে গ্রহান্তরে ল’য়ে যায় মোরে!
বাসনার বিপুল আগ্রহে-
জন্ম লভি লোকে-লোকান্তরে!
উদ্বেলিত বুকে মোর অতৃপ্ত যৌবন-ক্ষুধা
উদগ্র কামনা,
জন্ম তাই লভি বারে বারে,
না-পাওয়ার করি আরাধনা!….
যা-কিছু সুন্দর হেরি’ ক’রেছি চুম্বন,
যা-কিছু চুম্বন দিয়া ক’রেছি সুন্দর-
সে-সবার মাঝে যেন তব হরষণ
অনুভব করিয়াছি!-ছুঁয়েছি অধর
তিলোত্তমা, তিলে তিলে!
তোমারে যে করেছি চুম্বন
প্রতি তরুণীর ঠোঁটে
প্রকাশ গোপন।

যে কেহ প্রিয়ারে তার চুম্বিয়াছে ঘুম-ভাঙা রাতে,
রাত্রি-জাগা তন্দ্রা-লাগা ঘুম-পাওয়া প্রাতে,
সকলের সাথে আমি চুমিয়াছি তোমা’
সকলের ঠোঁটে যেন, হে নিখিল-প্রিয়া প্রিয়তমা!
তরু, লতা, পশু, পাখী, সকলের কামনার সাথে
আমার কামনা জাগে,-আমি রমি বিশ্ব-কামনাতে!
বঞ্চিত যাহারা প্রেমে, ভুঞ্জে যারা রতি-
সকলের মাঝে আমি-সকলের প্রেমে মোর গতি!
যে-দিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি-কাম,
সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম।
আমি কাম, তুমি হ’লে রতি,
তরুণ-তরুণী বুকে নিত্য তাই আমাদের অপরূপ গতি!
কী যে তুমি, কী যে নহ, কত ভাবি-কত দিকে চাই!
নামে নামে, অ-নামিকা, তোমারে কি খুঁজিনু বৃথাই?
বৃথাই বাসিনু ভালো? বৃথা সবে ভালোবাসে মোরে?
তুমি ভেবে যারে বুকে চেপে ধরি সে-ই যায় স’রে।
কেন হেন হয়, হায়, কেন লয় মনে-
যারে ভালো বাসিলাম, তারো চেয়ে ভালো কেহ
বাসিছে গোপনে।

সে বুঝি সুন্দরতর-আরো আরো মধু!
আমারি বধূর বুকে হাসো তুমি হ’য়ে নববধূ।
বুকে যারে পাই, হায়,
তারি বুকে তাহারি শয্যায়
নাহি-পাওয়া হ’য়ে তুমি কাঁদ একাকিনী,
ওগো মোর প্রিয়ার সতিনী।….
বারে বারে পাইলাম-বারে বারে মন যেন কহে-
নহে, এ সে নহে!
কুহেলিকা! কোথা তুমি? দেখা পাব কবে?
জন্মেছিলে জন্মিয়াছ কিম্বা জন্ম লবে?
কথা কও, কও কথা প্রিয়া,
হে আমার যুগে-যুগে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া!

কহিবে না কথা তুমি! আজ মনে হয়,
প্রেম সত্য চিরন্তন, প্রেমের পাত্র সে বুঝি চিরন্তন নয়।
জন্ম যার কামনার বীজে
কামনারই মাঝে সে যে বেড়ে যায় কল্পতরু নিজে।
দিকে দিকে শাখা তার করে অভিযান,
ও যেন শুষিয়া নেবে আকাশের যত বায়ু প্রাণ।
আকাশ ঢেকেছে তার পাখা
কামনার সবুজ বলাকা!

প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-আগণন,
তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন।
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়!
যে-পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়!
চির-সহচরী!
এতদিনে পরিচয় পেনু, মরি মরি!
আমারি প্রেমের মাঝে রয়েছ গোপন,
বৃথা আমি খুঁজে মরি’ জন্মে জন্মে করিনু রোদন।
প্রতি রূপে, অপরূপা, ডাক তুমি,
চিনেছি তোমায়,
যাহারে বাসিব ভালো-সে-ই তুমি,
ধরা দেবে তায়!
প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু,
বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম-
সে শরাব লোহু।
তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়,
ভৃঙ্গারে, গোলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!

দুই বিঘা জমি


     >>>রবী ঠাকুর
 
শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, 'বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।'
কহিলাম আমি, 'তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই -
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই।
শুনি রাজা কহে, 'বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা,
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা -
ওটা দিতে হবে।' কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, 'করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি।
সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!'
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,
কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, 'আচ্ছা, সে দেখা যাবে।'

পরে মাস-দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে -
করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।
এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য -
কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য।
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।
হাটে মাঠে বাটে এইমত কাটে বছর পনেরো-ষোলো,
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হল।।

নমোনমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি।
অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধুলি -
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ -
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল নিশীথশীতলস্নেহ।
বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে -
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথতলা করি বামে,
রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।।

ধিক্ ধিক্ ওরে, শত ধিক্ তোরে নিলাজ কুলটা ভূমি,
যখনি যাহার তখনি তাহার - এই কি জননী তুমি!
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাক-পাতা!
আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ -
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন,
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন!
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন -
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন!
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ী, ক্ষুধাহরা সুধারাশি।
যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী - হলে দাসী।।

বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি -
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে সেই আমগাছ একি!
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালককালের কথা।
সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন -
ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন।
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।
ভাবিলাম মনে, বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা।
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।।

হেনকালে হায় যমদূতপ্রায় কোথা হতে এল মালী।
ঝুঁটিবাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি।
কহিলাম তবে, 'আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব -
দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব।'
চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ;
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ -
শুনে বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, 'মারিয়া করিব খুন।'
বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।
আমি কহিলাম, 'শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!'
বাবু কহে হেসে, 'বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!'
আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোরে ঘটে -
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।।

Friday, December 30, 2011

২০১২ সালের সম্ভাব্য প্রযুক্তিপণ্যগুলো

৯ থেকে ১২ জানুয়ারী লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বের বৃহত্তম কনজিউমার ইলেকট্রনিক ট্রেড শো (সিইএস)। এ আয়োজন ঘিরে প্রযুক্তিবিশ্বে থাকে উন্মাদনা। কারণ এ আয়োজনের মধ্যে দিয়েই বছরের শুরুতেই বিভিন্ন বাঘা সব প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আসন্ন প্রযুক্তিপণ্য বিষয়ে ধারণা দেয় এবং বিভিন্ন প্রযুক্তির ঘোষণাও দেয়। কিন্তু এবারে অন্যতম জায়ান্ট মাইক্রোসফট জানিয়েছে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদটি। এবারই তারা শেষবারের মতো সিইএসএ অংশ নিচ্ছে। আর এ বছর কোনো ঘোষণা তারা নাও দিতে পারে। এদিকে, আরেক জায়ান্ট অ্যাপল ২০০৯ সাল থেকে নিজেরাই অনুষ্ঠান করে পণ্যের ঘোষণা দেয়। তবে, আরো অনেক প্রতিষ্ঠানই এবারের মেলায় তাদের প্রযুক্তিপণ্য ঘোষণা দেবে। ২০১২ সালে বাজারে আসতে পারে এমন সম্ভাব্য ১৫ টি প্রযুক্তিপণ্য নিয়েই এবারের মেইনবোর্ড।


নিনটেনডো উয়ি ইউ
গেইমিং জায়ান্ট নিনটেনডো নতুন একটি কনসোল বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে। ২০০৬ সালে উয়ি গেইমিং কনসোল আনার প্রায় পাঁচ বছর পর নতুন গেইমিং কনসোল আনার ঘোষণা দিলো নিনটেনডো। ২০১২ সালে উয়ি কনসোলটিরই ফলোআপ কনসোল আনছে প্রতিষ্ঠানটি। ‘উয়ি ইউ’ নামের এই গেইমিং কনসোলটি বিষয়ে নিনটেনডো থেকে বলা হচ্ছে, এটি হবে পরবর্তী প্রজন্মের গেইমিং কনসোল। উয়ি ইউ কনসোলটি ব্যবহার করে হাই-ডেফিনিশন ভিডিও দেখা, ওয়েব ব্রাউজসহ ভিডিও কলও করা যাবে। অনেক দিন ধরেই প্রযুক্তি বিশ্বে নিনটেনডোর উয়ি সংস্করণের আসন্ন একটি কনসোল বিষয়ে গুঞ্জণ ছিল। সম্প্রতি লস এঞ্জেলসের ই৩ গেইম শো উপলক্ষে এই গেইমিং কনসোলটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে নিনটেনডো। উয়ি ২ কনসোলটিতে থাকবে ৬.২ ইঞ্চির টাচস্ক্রিন এবং ক্যামেরা সুবিধা। এ ছাড়াও উয়ির প্রথম সংস্করণের মতো উয়ি ইউ-তে থাকবে সেট টপ বক্স। এ কনসোলটি এক্সবক্স ৩৬০ এবং প্লেস্টেশন ৩ কনসোলের মতোই গ্রাফিক্স সুবিধা দেবে। এইচডি সুবিধার এই গেইমিং কনসোলটির দামও হবে কম। গুজব রটেছে, বাজারে থাকা অন্যান্য গেইমিং কনসোলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে নতুন কনসোলের দাম মাত্রই ১৫০ ডলার রাখতে পারে জাপানি এ গেইম মেকার প্রতিষ্ঠানটি।


আইসক্রিম স্যান্ডউইচ ডিভাইসগুলো
গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ৪.০ অপারেটিং সিস্টেমের কোড নাম আইসক্রিম স্যান্ডউইচ। সদ্যই বাজারে আসা এ অপারেটিং সিস্টেমনির্ভর বেশকিছু পণ্য ২০১১ সালে বাজারে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্যামসাং-এর গ্যালাক্সি নেক্সাস। আইসক্রিম স্যান্ডউইচ নামের অ্যান্ড্রয়েডের সর্বশেষ সংস্করণের বৈশিষ্ট্য হলো, এটি স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট কম্পিউটারের প্রোগ্রামগুলোকে সমন্বয় করছে। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে সফটওয়্যার উন্নয়নকারীদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে নতুন এই প্লাটফর্মটি। এ অপারেটিং সিস্টেমনির্ভর অনেক ডিভাইস-এর ঘোষণা দিয়ে রেখেছে বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান। স্যামসাং, এইচটিসি, মটরোলা, আসুসসহ স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটনির্মাতা অনেক প্রতিষ্ঠানকেই আইসক্রিম স্যান্ডউইচনির্ভর ডিভাইস তৈরি করতে দেখা যাবে আগামী বছর। আইসক্রিম স্যান্ডউইচে বেশ কিছু নতুন অ্যাপ্লিকেশনও যোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রোবোটো টাইপফেস। অপারেটিং সিস্টেমটির নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যও আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত বলেই দাবী করা হচ্ছে। এতে ‘ফেস আনলক’ নামের একটি অ্যাপ্লিকেশন আছে। আগামী বছর তাই স্বাভাবিক কারণেই আইসক্রিম স্যান্ডউইচচালিত ডিভাইস চোখে পড়বে সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ২০১১ অ্যান্ড্রয়েড বাজার দখল করেছে শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি। আগামী বছর তা আরো বাড়বে বলেই গুগল আশা করছে।


আইপ্যাড মিনি
টেক জায়ান্ট অ্যাপল আইপ্যাডের একটি ছোটো সংস্করণ আনছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই গুজব চালু রয়েছে। গুজব রয়েছে, অ্যাপল ৭ ইঞ্চি বা ৭.৮৫ ইঞ্চি আইপ্যাড মিনি তৈরি করবে, আর এই ডিভাইসটি বাজারে চলে আসবে আগামী বছরই। বলা হচ্ছে, অনলাইন রিটেইলার জায়ান্ট অ্যামাজনের তৈরি ‘কিন্ডল ফায়ার’ ট্যাবলেটটির সঙ্গে বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নামতেই ‘আইপ্যাড মিনি’ তৈরি করছে অ্যাপল। এ ডিভাইসটির নাম আইপ্যাড মিনি বা আইপ্যাড এইচডি রাখতে পারে অ্যাপল। এ ডিভাইসটিতে ‘বড়ো’ আইপ্যাডের সব প্রযুক্তিই থাকবে। ২০১০ সালে দায়িত্বে থাকা অ্যাপলের সিইও স্টিভ জবস ‘আইপ্যাড মিনি’ বা ৭ ইঞ্চি মাপের ট্যাবলেটের গুজব উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ট্যাবলেট স্ক্রিনের মাপ কমপক্ষে ১০ ইঞ্চি হওয়া উচিত। আর তা না হলে অ্যাপ্লিকেশন মানানসই হবে না। এ ছাড়াও টাচস্ক্রিনের কতোটা কাছে থেকে কনটেন্ট দেখা হবে তারও একাট সীমা থাকা প্রয়োজন। নতুন সংস্করণটি দামের দিক থেকেও নাকি হবে ‘মিনি’। ২০০ ডলারের মধ্যেই পাওয়া যাবে এ ট্যাবলেট। ২০১২ সালের শেষদিকে এ ট্যাবলেটটি বাজারে আনতে পারে অ্যাপল। অবশ্য, ২০১২ সালে ফেব্রæয়ারিতে আইফোন ৫ এবং আইপ্যাডের নতুন সংস্করণ আসতে পারে বলেই প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।


আলট্রাবুক
প্রযুক্তিবিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১২ সাল হবে আলট্রাবুকের। কারণ, মানুষের রুচির সঙ্গে মানিয়ে যাবে হালকা-পাতলা আলট্রাবুক। ডিভাইস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছরই আলট্রাবুক তৈরির কাজ শুরু করেছে। নেটবুক এবং ভারী ল্যাপটপ তৈরি বন্ধ করে আলট্রাবুক তৈরিতে আগামী বছরও লেগে থাকবে অনেক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সবার আগে আছে ইনটেল। এরপর রয়েছে ডেল, এইচপি অ্যাপলসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই। এদিকে, আলট্রাবুকের দামও কমছে তাই আগামী বছর হবে উন্নত আলট্রাবুকের বছর। ২০১২ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আলট্রাবুকের ঘোষণা দেবে।


পরবর্তী প্রজন্মের ম্যাকবুক এয়ার
টেক জায়ান্ট অ্যাপল ম্যাকবুক প্রো এবং ম্যাকবুক এয়ার-এর নতুন সংস্করণ তৈরি করছে বলেই খবর রটেছে। বিভিন্ন প্রযুক্তিসাইটের বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, যারা অ্যাপল ল্যাপটপ কেনার চিন্তা করছেন তারা একটু রয়ে সয়ে কিনলেই আনকোরা কনফিগারেশনের ম্যাকবুক প্রো বা এয়ার-এর মডেল কিনতে পারবেন। জানা গেছে, নতুন মাপের ১৩ ইঞ্চি, ১৫ ইঞ্চি এবং ১৭ ইঞ্চি স্ক্রিনের তিনটি ডিভাইস বাজারে আনছে অ্যাপল। নতুন ডিভাইসগুলোয় নকশায় কোনো পরিবর্তন না থাকলেও প্রসেসর হিসেবে যোগ হচ্ছে ইনটেলের স্যান্ডিব্রিজ। এছাড়াও আইভিব্রিজ প্রসেসরযুক্ত ম্যাকবুক প্রো তৈরি করছে অ্যাপল। সে ডিভাইসগুলোও আসবে আগামী বছরই। নতুন ডিভাইসটি ম্যাকবুক এয়ারের মতোই পাতলা হবে, তবে এর পর্দার মাপ হবে এয়ারের চেয়ে বড়। নতুন মডেলের ডিভাইসগুলো হতে পারে ১৫ ইঞ্চি এবং ১৭ ইঞ্চি মাপের। নতুন ডিভাইসগুলোতে স্যান্ডিব্রিজ প্রসেসরের বদলে উন্নত আইভিব্রিজ প্রসেসর ব্যবহৃত হতে পারে। বর্তমানে বাজারে থাকা অ্যাপলের ম্যাকবুক সিরিজে পাতলা ম্যাকবুক এয়ারের সর্বোচ্চ মাপ ১৩ ইঞ্চি। কিন্তু জাপানী প্রযুক্তিসাইট ম্যাকোতাকারা’র তথ্য মতে, অ্যাপল এবারে পাতলা মডেলের ডিভাইসগুলোর মাপ আরো বড়ো করছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে পাতলা নোটবুক এখন অ্যপলের ম্যাকবুক এয়ার।


কিন্ডল ফায়ার ২
চলতি বছর মাত্র ৭ ইঞ্চি মাপের একটি ট্যাবলেট বাজারে ছাড়ে অ্যামাজন। কিন্ডল ফায়ার নামের এ ট্যাবলেটটি বাজারে মাত করতে খুব কম সময়ই নিয়েছে। আগামী বছরই এই অনলাইন রিটেইল জায়ান্ট কিন্ডল ফায়ার ট্যাবলেটের নতুন সংস্করণের আনছে বলেই খবর রটেছে। নতুন সংস্করণের এ ডিভাইসটির পর্দাম মাপ হবে ৮.৯ ইঞ্চি। বাজারে ৮.৯ ইঞ্চির ট্যাবলেট হিসেবে এটিই হবে প্রথম। এ ছাড়াও ১০ ইঞ্চি কিন্ডল ফায়ার-এর একটি মডেল আনতে পারে এমন খবরও রটেছে। প্রথমে ৭ ইঞ্চি মাপের কিন্ডল ফায়ারের পরবর্তী সংস্করণ হিসেবে অ্যামাজন ১০.১ ইঞ্চি মাপের নতুন ট্যাবলেট আনতে পারে বলে গুজব ছিলো। কিন্তু ট্যাবলেট বিপননকারীরা নাকি বাজারে থাকা ৯.৭ এবং ১০.১ ইঞ্চি মাপের ট্যাবলেটের আধিক্য থাকায় নতুন সংস্করণের মাপে ভিন্নতা চেয়েছে। তাই, অ্যামাজন কিন্ডল ফায়ারের পরবর্তী সংস্করণ হিসেবে ৮.৯ ইঞ্চি মাপের ট্যাবলেটই তৈরি করবে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ এ ডিভাইসটি বাজারে আসতে পারে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বাজারে এসেছে অ্যামাজনের ৭ ইঞ্চি মাপের কিন্ডল ফায়ার ট্যাবলেট। মাত্র ১৯৯ ডলারের এ ট্যাবলেটি বিক্রিতে অ্যামজন লসও গুনছে। কিন্তু জনপ্রিয়তার কারণে এবার স্মার্টফোন বাজারেও অ্যামাজনের পা পড়ছে বলেই খবর রটেছে। ট্যাবলেট এবং স্মার্টফোন দুক্ষেত্রেই এবছর অ্যামাজনকে চাঙ্গা দেখা দিতে পারে।


আইফোন ৫
২০১১ সালে প্রযুক্তিবিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাব্য স্মার্টফোন আইফোন ৫। এ ফোনটি ঘিরে গুজবের ছড়াছড়ি ছিলো সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরই এ ফোনটি বাজারে আসছে বলে ধারণা করেছিলেন প্রযুক্তিবিশ্লেষকরা। কিন্তু অ্যাপল গুজবে জল ঢেলে আইফোন ৫ না এনে আইফোন ৪ এস সংস্করণটি বাজারে ছাড়ে। কিন্ত গুজব এখানেই থেমে যায়নি। গুজবে প্রকাশ, আইফোন ৫ তৈরি করেছিলো অ্যাপল কিন্তু সিইও স্টিভ জবস-এর তা পছন্দ না হওয়ায় তিনি আইফোন ৫ বাজারে আনতে নিষেধ করেন। এরপরই আনা হয় আইফোন ৪এস। ৫ অক্টোবর স্টিভ জবস মারা যাবার পর নতুন আইফোন নিয়ে কাজ শুরু করেছে অ্যাপল এমন খবর চাউর হয়েছে। আইফোন ৫ আসলে দেখতে কেমন হবে তার বিভিন্ন কাল্পনিক মডেল ঘুরছে ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটে। তবে, অ্যাপল মুখ না খুললেও প্রযুক্তিবিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে প্রতিদ্বন্দিতা বেড়ে যাওয়ায় আগামী বছরই আইফোন ৫ বাজারে আনবে অ্যাপল।


অ্যাপল আইটিভি
অ্যাপলের প্রয়াত সিইও স্টিভ জবস ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অ্যাপল আইটিভি নামের একটি টিভি তৈরি করছে। আগামী বছর অ্যাপল-এর আইটিভির দেখা মিলতে পারে। টেক জায়ান্ট অ্যাপল ‘আইটিভি’ নামে নতুন টেলিভিশন তৈরি করছে বলে তথ্যও দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের এক প্রযুক্তি বিশ্লেষক। নতুন এ টেলিভিশনে এক্সবক্স গেইমিং কনসোলের মতো জেশ্চার বা অঙ্গভঙ্গি বুঝতে পারার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। জেশ্চার প্রযুক্তিটি পরিচালক এবং নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘মাইনোরিটি রিপোর্ট’ ছবিতে দেখানো হয়েছিলো। পরে কাইনেক্ট ডিভাইসে এমন প্রযুক্তি আনে মাইক্রোসফট। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমেও এমন প্রযুক্তি আনার কথা মাইক্রোসফট ভাবছে বলে বাজারে গুজব রয়েছে। তবে, প্রযুক্তিবিশ্লেষকের দাবী, অ্যাপল কর্তৃপক্ষ টিভিতে যে প্রযুক্তি আনছে তার ব্যবহার গেইমিং কনসোলের চেয়েও বেশি হবে। আইটিভিতে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে টিভির সামনে কোনো দর্শক মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি করলে টিভি সেটা বুঝতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিবিশ্লেষক পিটার মিসেক জানিয়েছেন, নতুন প্রযুক্তির এমন টিভি তৈরির পরিকল্পনা করে গেছেন অ্যাপলের প্রয়াত সিইও স্টিভ জবস। তার বায়োগ্রাফিতেও এমন ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন তিনি। ’ জায়ান্ট অ্যাপল ‘আইটিভি’ নামের টেলিভিশন আনতে পারে আর তাতে নতুন অনেক ফিচারের সঙ্গে হার্ডওয়্যার হিসেবে যোগ হতে পারে আইস্ক্রিনও। এ টিভিতে বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনের পাশাপাশি বাঁকানো স্ক্রিন থাকতেও পারে বলে প্রযুক্তিবিদরা ধারণা করছেন। অবশ্য, অ্যাপল কর্তৃপক্ষ টিভি স্ক্রিন বিষয়ে মুখ বন্ধ করে রেখেছে।


আইপ্যাড ৩
সম্প্রতি গুজব রটেছে, টেক জায়ান্ট অ্যাপলের তৈরি আইপ্যাডের তৃতীয় সংস্করণ তৈরির কাজ শেষ করে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি, এখন কেবল বাজারে ছাড়তেই যা দেরি। খবর রটেছিলো, ২০১১ সালে আইফোন ৫ এবং আইপ্যাড ৩ একসঙ্গে বাজারে এনে চমকে দেবে অ্যাপল। কিন্তু অ্যাপল সিইও স্টিভ জবস মারা যাবার আগে কেবল আইফোন ৪ এস ডিভাইসটির ঘোষণা দেয় তারা। এদিকে আইপ্যাড ঘিরে রহস্য থেকেই যায়। এখন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছর এ ডিভাইসটি বাজারে আনবে অ্যাপল। জানা গেছে, ডিভাইসটির নাম আইপ্যাড এইচডিও রাখতে পারে অ্যাপল। আইপ্যাড ঘিরে অনেক গুজব চাউর হলেও একটা গুজবের সঙ্গে সবগুলোর মিল রয়েছে; আর তা হচ্ছে- রেটিনা ডিসপ্লে। এ ছাড়াও অ্যাপলের এ ডিভাইসটিতে যোগ হতে পারে গ্লেয়ার প্রটেক্টর, হ্যাপটিক ফিডব্যাক, বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি এবং তার ছাড়াই চার্জ দেবার মতো ফিচারগুলো। বর্তমানে বাজারে থাকা আইপ্যাডের দ্বিতীয় সংস্করণের চেয়ে আইপ্যাড ৩ বেশ হালকা-পাতলা হবে বলেই জানা গেছে। উল্লেখ্য, আইপ্যাড প্রথম বাজারে আসে ২০১০ সালের এপ্রিলে। তারপর আইপ্যাডের দ্বিতীয় সংস্করণ আইপ্যাড ২ বাজারে আসে ২০১১ সালের মার্চ মাসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন আইপ্যাড আগামী বছরের ২০১২ ফেব্রæয়ারি মাসে বাজারে আসবে। অ্যাপল এই মুহূর্তে সারাবিশ্বের ৬৫% ট্যাবলেট বাজার দখল করে আছে।


প্লেস্টেশন ভিটা
জাপানের রাজধানী টোকিও শহরে গত ১৭ ডিসেম্বর নতুন প্লেস্টেশন ভিটা বাজারে এনেছে সনি। খবর রটেছে, আগামী বছর প্লেস্টেশন ভিটার নতুন সংস্করণটি আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়বে তারা। নতুন সংস্করণের এই গেইমিং ডিভাইসটিতে থাকবে ডুয়াল এনালগ স্টিক, টাচ স্ক্রিন। সম্প্রতি জাপানের বাজারে আসা নতুন প্লেস্টেশনে রয়েছে ৫ ইঞ্চি মাপের পর্দা (১২ সেন্টিমিটার), এলইডি টাচস্ক্রিন, দুটি ক্যামেরা এবং জিপিএস রিসিভার ছাড়াও ওয়াইফাই এবং থ্রিজি সুবিধা। নতুন এ ডিভাইসটিতে ২০টি গেইম পাওয়া যাবে একেবারেই বিনামূল্যে। কেবল জাপানের বাজারে এ ডিভাইসটি আসায় ইতোমধ্যে বাজারে বেশ আগ্রহ বাড়িয়েছে। ২২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করলে এটি আরো বাজার দখল করবে বলেই বাজার বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।


৪ জি ফোন
বাজারে আসবে বিভিন্ন মডেলের ফোরজি ফোন এবং ফোরজি সার্ভিস। বিভিন্ন টেলিকেম সার্ভিস তাদের গ্রাহকদের জন্য ফোরজি সুবিধার স্মার্টফোন তৈরি করবে। ফোরজি স্মার্টফোন তৈরি করতে এইচটিসি, স্যামসাং, অ্যাপল, মটেরোলাসহ অনেকেই এগিয়ে আসবে আগামী বছরই।


নুক ট্যাবলেট ২
বার্নস এন্ড নোবল তাদের নুক ট্যাবলেট-এর দ্বিতীয় সংস্করণ আগামী বছর বাজারে আনতে পারে। ২০১১ সালে রঙিন নুক ট্যাবলেট পিসি বাজারে ২৪৯ ডলার মূল্যমানের এই ট্যাবলেটটিতে রয়েছে ৭-ইঞ্চি ডিসপ্লে, ১ গিগাহার্টজ ডুয়াল-কোর প্রসেসর, ১ জিবি র‌্যাম এবং ১৬জিবি স্টোরেজ। নুক ট্যাবলেটের দ্বিতীয় সংস্করণে আরো উন্নত ফিচার যোগ করছে বার্নস এন্ড নোবেল।


নিকন ডি ৮০০
৯-১২ জানুয়ারি লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বের বৃহত্তম কনজিউমার ইলেকট্রনিক ট্রেড শো (সিইএস)-এ আসতে পারে নিকন ডি ৮০০ মডেলের ক্যামেরা। ২০০৮ সাল থেকে বাজারে রয়েছে নিকন এসএলআর ক্যামেরা ডি৭০০। এ মডেলটির পরবর্তী সংস্করণই আগামী বছর বাজারে আসতে পারে। এ মডেলের ক্যামেরা হবে নিকনের সবচেয়ে বেশি রেজুলিউশনের ক্যামেরা। ছোট আকারের এ ক্যামেরায় ৩৬ মেগাপিক্সেলে ছবি তোলা যাবে। এতে থাকবে উন্নত অটোফোকাস এবং ফেস ডিটেকশন ব্যবস্থা । থ্রিডি ভিডিও করা যাবে এ ক্যামেরায়। এ ক্যামেরার দাম হতে পারে ৩ হাজার ডলার এর মত।


ক্যানন ৫ডি মার্ক ৩
নিকন ডি ৮০০ মডেলের মতো ক্যাননের ফুল-ফ্রেম ফলো-আপ ইওএস ৫ডি মার্ক ৩ বাজারে আসবে আগামী বছরই। ২০১১ সালেই ক্যানন ৫ডি মার্ক ৩ সংস্করণটি বাজারে আসার খবর রটেছিলো। কিন্তু জাপানের ভূমিকম্প এবং সুনামির পাশাপাশি থাইল্যান্ডের বন্যা পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় ক্যামেরায় নতুন সংস্করণটি ছাড়েনি ক্যানন। নতুন সংস্করণের ৫ডি মার্ক ৩-এর দাম আড়াই হাজার ডলারের বেশি হতে পারে।


উইন্ডোজ ৮
উইন্ডোজ ৮কে বলা হচ্ছে মাইক্রোসফটের বাজীর ঘোড়া। টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটের তৈরি অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ ৮ ঘিরে প্রযুক্তি বিশ্বে অনেকদিন ধরেই আলোচনা হয়েছে। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মাইক্রোসফট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এ অপারেটিং সিস্টেমের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে নিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার বিল্ড ডেভেলপারস কনফারেন্সে উইন্ডোজ ৮ বাজারে আনার কথা জানিয়েছেন মাইক্রোসফট উইন্ডোজ বিভাগের প্রেসিডেন্ট স্টিভেন সিনোফস্কি। কম্পিউটার, ট্যাবলেট এবং ল্যাপটপ প্ল্যাটফর্মের জন্য ব্যবহৃত হবে এ সংস্করণটি। আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উইন্ডোজ ৮ সম্পূর্ণ নতুন ফিচার নিয়ে হাজির। এ প্রসঙ্গে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ বিভাগের প্রেসিডেন্ট স্টিভেন সিনোফস্কি জানিয়েছেন, ‘আমরা উইন্ডোজকে নতুন করে সাজিয়েছি। উইন্ডোজ ৯৫ সংস্করণের পর অপারেটিং সিস্টেম আপগ্রেডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উইন্ডোজ ৮ কেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ সফটওয়্যারটি কোনো অ্যাপস ছাড়াই নতুন ক্ষমতার। ’

এবারের ‘বিল্ড’ নামে ডেভেলপার্স কনফারেন্সে টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ৮ এর বিভিন্ন ফিচার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্টিভেন সিনোফস্কি বলেছেন, ‘অন্যান্য সংস্করণে মাল্টিটাস্কিং সুবিধার কথা বলা হলেও উইন্ডোজ ৮ এ পাওয়া যাবে আসল মাল্টিটাস্কিং-এর মজা। ’ কেবল ট্যাবলেট নয়, এ অপারেটিং সিস্টেম ডেস্কটপ এবং ল্যাপটপের জন্যও। উইন্ডোজ ৮ এ ব্যবহার করা হয়েছে হাইপার- ভি ভার্চুয়ালাইজেশন; যার ফলে উইন্ডোজ ৭ বা তার আগের সংস্করণের জন্য তৈরি অ্যাপ্লিকেশনগুলোও এখানে কাজ করবে। এতে থাকবে একটি অ্যাপ্লিকেশন স্টোর, যেখান থেকে ব্যবহারকারীরা নানান অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। ক্লাউড কম্পিউটিংভিত্তিক এ অপারেটিং সিস্টেমে ডেভেলপারদের অ্যাপ্লিকেশন তৈরির জন্য নানান টুলস দিয়ে দেয়া হয়েছে যা ইতোমধ্যেই ডেভেলপারদের কাছে প্রশংসা পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘টেক জায়ান্ট অ্যাপলের অপারেটিং সিস্টেমকে টক্কর দিতেই নতুন করে ভাবতে হয়েছে মাইক্রোসফট কর্তৃপক্ষকে। ’

নতুন অনেকগুলো ফিচার রয়েছে উইন্ডোজ ৮-এ। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইউজার ইন্টারফেস, টাচ, স্কাইড্রাইভ, অ্যাপস্টোর, এআরএম প্রসেসর, টাস্ক ম্যানেজারসহ বেশ কিছু নতুন ফিচার। এ ছাড়াও উইন্ডোজ ৮ অপারেটিং সিস্টেমে নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন পাসওয়ার্ড ব্যবস্থা আনছে মাইক্রোসফট। পাসওয়ার্ড হিসেবে প্রচলিত অক্ষর ছাড়াও টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফট তাদের নতুন অপারেটিং সিস্টেমে ছবি পাসওয়ার্ড ব্যবস্থা আনছে বলে খবর রটেছে। বিশ্বের বৃহত্তম কনজিউমার ইলেকট্রনিক ট্রেড শো (সিইএস) থেকে সরে যাবার ঘোষণা দিয়েছে টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফট। মাইক্রোসফট-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ৯-১২ জানুয়ারি লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিতব্য সিইএস মেলায় এবারই তারা শেষবারের মতো অংশ নেবে। এ মেলাতেই উইন্ডোজ ৮-এর ঘোষণা দিতে পারে মাইক্রোসফট এমন ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। তবে মাইক্রোসফট বলছে, তারা যখন নিজেদের সুবিধামত সময় আসবে তখন অ্যাপলের মতো নিজেরা পণ্য প্রদর্শনের আয়োজন করে নতুন পণ্য আনার ঘোষণা দেবে। নতুন পণ্য আনার জন্য আর সিইএস মেলাকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নেয়া হবে না। ২০১২ সালে মাইক্রোসফট নিজেরা অনুষ্ঠান করে হয়তো উইন্ডোজ ৮-এর ঘোষণা দেবে বলেই প্রযুক্তিবিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

Thursday, December 29, 2011

এবং একটি সিনেম্যাটিক বিয়ে...

ক্লাসে ঢুকতেই ডানদিকের কোণ হতে হেড়ে গলাটা ভেসে এলো ...

"তুমি বেশ বদলে গেছোওওও
পুরোনো সৈকতে আর পানশী ভেরাও না আআআআ !!"

বাসায় সবার সাথে সাত সতেরো নানা কিছু নিয়ে ঝগড়া করে ক্লাসে এসেছি , মেজাজ এমনিতেই সপ্তম , অষ্টম বাদ দিয়ে একেবারে নবমে চড়ে আছে আর ফাজিলটার ফাজলামি বন্ধ হয় না ! চড়ায়ে চাবকায়ে গাল পিঠ সব লাল নীল বানায়ে দেয়া দরকার ।

ব্যাগটা ধড়াম করে ডেস্কে রেখে ফাজিলটার কাছে গেলাম , কান টেনে আজ আধ হাত লম্বা করে দেবো !

ঐ ইতর , কোনা থেকে হাঁড়িচাচার মত চেঁচাচ্ছিস ক্যান ?

"আহ্ ! কতদিন শুনিনি গালিইইই
তবু ... মনে পড়ে তব সব গালিইইই "

ঐ আবার ? আবার ? সমস্যা কি ? হেমন্তের গানের তো সাড়ে তেরোটা বাজিয়ে দিলি ? অফ যা !

ম্যাডাম কি সকালে করল্লার জুস খেয়ে এসেছেন ?

না রে তবে টয়োটা করল্লার বারোটা বাজায়ে দিয়ে আসছি ! দাঁত বের করে হাসলাম ।

ঘটনা কি দোস্ত ? শোভন অতিরিক্ত মাত্রায় উত্‍সাহী হয়ে বকের মত গলাটা বাড়িয়ে দেয় !


ও আচ্ছা , আমি তো শোভনের পরিচয় দেইনাই এখনো । আমি আর শোভন , ভার্সিটির সবচেয়ে হিট জুটি । এইচ এস সি তে চায়না পান্ডার মত বিশাল সাইজের ব্যাম্বু খাবার পর দুজনেই একসাথে একটা প্রাইভেট ইউনিতে ভর্তি হয়ে যাই । তার কারণ ও ছিল ! এডমিশন টেস্ট দিলে কে কোন মুল্লুকে পড়তাম কে জানে , আমি আর শোভন আর যাই হোক দুজন একসাথে কলেজ থেকে আছি ।

কলেজ লাইফের সময় দিনের চব্বিশ ঘন্টার চৌদ্দ ঘন্টাই একসাথে কাটিয়েছি আর এখন বিশ ঘন্টাই কোন না কোন ভাবে একসাথে থাকা হয় , যতক্ষন পাশে থাকিনা , ভার্চুয়ালি পাশে থাকি , চিন্তা কি ফেসবুক হ্যায় না ?

ইত্যাদি সব কারণে ক্লাসের বেবাক মানুষের ধারণা হয়েছে শোভন আর আমার মাঝে হয়তো কোন চক্কর আছে ! শুধু আমি জানি ওর ভেতরের খবর ! ক্লাস সিক্স থেকে কোন মেয়ের উপর পোলটি খেয়ে আছে , তুমি আমার প্রথম প্রেমে মগ্ন মজনু আজো গ্রীণ সিগনাল পায়নি ,তাতে কি নিয়মিত ঐ মেয়ে কে তার জ্বালানো চাই !


একদিন রাতের তিনটার সময় আমাকে ফোন দিয়ে বলে দোস্ত জানিস কি হয়েছে ?

এমনেই আমার ঘুম টুম হয় না যাও একটু ঘুমিয়েছি এই ইতরের তা সহ্য হয় নাই ! মেজাজ কোনরকমে কন্ট্রোলে রেখে জানতে চাইলাম

সে তার বিখ্যাত হে হে হাসি দিয়ে বলে জুঁইরে ফোন দিসি ।

তো ?

কথা হইসে ! [আবার হেহে হাসি !]

তো ?

ওরে ফার্স্ট কি বলসি জানিস ?

কি ?

তোমার বাসার টেবিল ক্লথ কি রঙের ?

ও কি করসে ?[আমার মাথায় আগুন ধরে গেসে]

ও ফোন রেখে দিসে !!

খুব ভাল করসে , বলে আমিও ফোন কেটে দিয়েছিলাম ! এরকম আজাইরা খেজুরে পকপকানি করতে করতেই আমাদের অনেক দিন কেটে গেছে , এখন আমরা ফোর্থ ইয়ারে । শোভন তার নায়িকা নিয়ে খুব এগোতে পারে নাই , আমার বাসাতে বিয়ে নিয়ে সব পাগল হয়ে গিয়েছে এমনি একদিনে ক্লাসে রেগে মেগে এসেছি , বাকী টুকু তো জানেন ই !


শোভনের সামনে ঝোঁকানো মাথায় একটা বাড়ি দিয়ে বললাম ,৪ টয়োটা করল্লার মালিকের সাথে আমার বিয়ে !

"ভালো না !" মুখ বেঁকিয়ে শোভনের উত্তর ।

আমি অবাক হয়ে বললাম,"ক্যান ?"

"প্রিমিও হলে ভালো হইতো" , বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব নিয়ে উত্তর দিল ।


আমার খুব রাগ হলো , ব্যাগ নিয়ে বাসায় চলে এলাম । সোজা মায়ের ঘরে ঢুকে বললাম , মা আমি বিয়েতে রাজী ।

তারপর সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে যেতে লাগলো , এনগেজমেন্ট এর পর ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ করে দিলাম , মোবাইলের সিমটাও চেন্জ করলাম । কেন কি করছি জানি না , কারো উপর খুব অভিমান হচ্ছে ।

সময় যেন আমার হাতের তালুতে থাকা ঘোড়া হয়ে গেলো , টগবগ টগবগ করে পেরিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু আমি হাত মুঠো করেও আটকাতে পারছিনা !


এমনি করেই আমার বিয়ের দিন এসে গেলো । বউ সেজে স্টেজে বসে আছি , শোভন এসে আমার পাশে বসলো । আমার খুব ইচ্ছে করছিলো ওকে কষে দুটো চড় লাগাতে ! ওকে দেখে আমার বুকের ভেতরে কেমন একটা দোমড়ানো মোচড়ানো অনুভূতি , খুব কষ্ট করে বললাম , ভাল আছিস ?


গত কয়েকদিন ধরেই শোভন আমাদের বাড়ীতে , বিয়ের যাবতীয় কাজ সে নিজ হাতে করেছে । খুব উত্‍ফুল্ল একটা ভাব ও দেখিয়েছে । এতো খুশির কারণ কি আল্লাহ মালুম !

দাঁত কেলিয়ে শোভন উত্তর দিলো

তুই জানিস তোর বর প্রিমিও নিয়ে আসবে ?


আমার মেজাজ খারাপের শেষ সীমায় চলে গেছে , ওকে শুধু বললাম তুই যা এখান থেকে ।

শীষ বাজাতে বাজাতে ভয়াবহ নির্বিকার ভাব নিয়ে ও চলে গেলো , ছেলেটাকে কি তবে আমি একাই এতো ভালবেসেছি ? আমার খুব কান্না পাচ্ছে , খুব বেশি ।


কেমন করে কাজী কে কবুল বলেছি জানি না , কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করছিল ঐ সময়ে , আমি এখন আরেকজনের বৌ , এটা ভাবতেই মাথা ঘুরাচ্ছে ! শুভ দৃষ্টির সময় আমার সদ্য হওয়া জামাই আমার পাশে এসে বসলো , ইচ্ছে করছিলো একলাফে উঠে যাই ! গোল আয়নাটা সামনে এনে যখন রাখলো থাবা দিয়ে ঐটা ভাঙার ইচ্ছা খুব কষ্টে সামাল দিলাম ! চোখ দুইটা জলে ভরে যাচ্ছে , কীসের শুভ দৃষ্টি , কীসের কী ?

আয়না থেকে ওড়না সরিয়ে সবাই চোখ রাখতে বলছিল , আয়নায় দৃষ্টি পড়তেই আমি ও মা "একি" বলে ফিট হয়ে গেলাম !


ঘোড়ার গাড়িতে বসে আছি , এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না শোভনের সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে ।

শোভনের ম্যালা ফিচলামি বুদ্ধি আছে ,কিন্তু বিয়ের মতো ব্যাপারে ও সে এটা দেখাবে বুঝিনাই ।

বর পক্ষকে সে এবং আমার আপন ছোটভাই যেয়ে বলে এসেছে নিজেদের কিছু সমস্যায় বিয়েটা নেক্সট উইকে হবে , সব ঠিক ঠাক শুধু আজকের জায়গায় নেক্সট উইক । ঐ বেচারা রা সরল বিশ্বাসে তা মেনেও নিয়েছে । এই ফাঁকে শোভন তার পরিবার নিয়ে এসে আমাকে বিয়েই করে ফেললো ! আত্নীয় স্বজন এবং সমাজ ইত্যাদির জন্যে আম্মা আব্বাও ঝামেলা করে নাই ।

পান থেকে চুন খসলে যে কি হতো চিন্তা করে আমি শিউরে উঠছিলাম ।


হঠাত্‍ শোভন আমার হাতে হাত রাখলো । আমার কানের কাছে মুখ এনে বললো , কীরে প্রিমিও পছন্দ হয়েছে ?

অনেক আগে কোন এক বিকেলে বলেছিলাম , আমি শশুড়বাড়ী ঘোড়ার গাড়ী করে যাবো , সব ও মনে রেখেছে ! চোখ বারবার ভিজে আসছিলো !

ওর হাতেও দু এক ফোঁটা পড়েছিলো , ও আবার কানের কাছে মুখ এনে বলল , আজকে যা কাঁদার কেঁদে নে , ফিউচারে কাঁদতে দেখলে চোখ গেলে দিবো !

তারপর বেসুরো হেঁড়ে গলায় গান ধরল,
"তুমি আর নেই সে তুমিইইই
ছিলে বান্ধবী হলে বউউউউ
তুমি আর নেই সে তুমি..."


(সত্যি কাহিনী অবলম্বনে)


-নূহা চৌধুরী

একজন মায়ের গল্প

সাফিয়া বেগম,ছোটখাট গড়নের একজন আদর্শ বাংগালী মা।তৎকালীন সময়ের অন্যতম ধনী প্রকৌশলী ইউনুস সাহেবের স্ত্রী।এই মায়ের কোলজুড়ে প্রথম যে সন্তানটি আসেন সেটি ছিল মেয়ে।আদর করে মেয়ের নাম রাখা হয় বিন্দু।সাফিয়া বেগমের জান ছিল ছোট্ট মেয়েটি।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস,মেয়েটি খুব অল্প বয়সেই মারা যায়।মা দুঃখে শোকে ভেঙ্গে পড়েন।এর কিছুদিন পর ১৯৪৬ সালে জন্ম হয় আজাদের।

আজাদ এলভীস প্রিসলির বিশাল ভক্ত।গান শুনে,বই পড়ে,নাজ সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যায় বারো আনা টিকেটের পয়সা দিয়ে।সাথে তার শিষ্যের মত থাকে খালাতো ভাই জায়েদ।মা সাফিয়া বেগম তার এই ছেলেটিকে অসম্ভব ভালবাসতেন।নিজের হাতে না খাইয়ে দিলে মনে করতেন "আমার বাছা তো কিছুই খায়নাই।ছেলেতো আমার মাছটাও বাছতে পারেনা"।
এভাবেই আদরে আদরে মানুষ হয় মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মেলে ভেসে বেড়ানো ছেলেটি।

একসময় তিনজনের এই ছোট্ট সংসারে আগুন ধরে যখন আজাদের পিতা তারই এক দুঃসম্পর্কের ভাইয়ের বউকে বিয়ে করে ঘরে আনেন।মা সাফিয়া বেগম সেই যে আজাদকে নিয়ে ইস্কাটনের রাজপ্রসাদ ত্যাগ করেন আর কোনদিন ওদিকে যাননি।প্রচন্ড জেদী এই মা তার স্বামীকে কোনদিন এই কাজের জন্য ক্ষমা করেননি।আমৃত্যু তিনি নিজের মুখ একবারো স্বামীকে দেখাননি।

ধীরে ধীরে আজাদ বড় হয়,আই.এস.সি পাশ করে।আর ততদিনে তার পিতাও বুঝতে পারেন ছেলে আর মা কোনদিন তার বশ্যতা শিকার করবেনা।একসময় মা সাফিয়া বেগমকে গলাবার জন্য,তিনি আজাদকে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে পাঠান।মা দেখলেন উত্তল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি আর গোলাগুলিতে মত্ত।সেখানে আদরের একমাত্র ছেলেকে তিনি কি করে পড়ান?যদি কোন অঘটন হয়?অবশেষে তাই মায়ের ইচ্ছায় আজাদ করাচি চলে যায় ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য।

করাচি গিয়ে আজাদ দেখতে পায় কি নিদারুণ বৈষম্য চলছে পশ্চিমের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের।৯৪ ভাগ পশ্চিমের জন্য বরাদ্দ রেখে মাত্র ছয়ভাগ দেয়া হয় পূর্বের অবহেলিত জনগণের জন্য।আজাদ জানতে পারে এই পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদেরকে ঠিকমত মুসলমান ভাবতেই নারাজ।যখ্নই জানতে পারে আজাদ পুব থেকে এসেছে কেমন যেন একটা অবহেলা দেখতে পায় সে ওই পশ্চিমাদের চোখে।ভাল লাগেনা আজাদের এই দেশ।বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছা করে বাংলার মাটিতে।তার মাকে লিখে জানায় "মা এইটা আমার দেশ না।আমার দেশ ওইখানে যেখানে তুমি আছো।"

একসময় বি.এস.সি শেষ করে মায়ের অসুখের খবর পেয়ে দেশে ফিরে আসে আজাদ।মা তখন মালিবাগের এক ছোট্ট বাসায় ভাড়া থাকে।আজাদ বুঝতে শিখে তার মা আট দশটা মায়ের মত নয়।শহীদ জননী জাহানারা ইমাম আসেন মাঝেসাঝে মাকে দেখতে।তিনি দেখতে পান এই নরম কোমল দেখতে মহিলাটি আসলে কতটা দৃঢ়,যে স্বামীর কাছে কখনো হারতে রাজি নয়।

একদিন সেই ভয়াল রাত আসে।ওই বিভৎস ২৫শে মার্চের রাত।স্বচক্ষে আজাদ এক ভয়াবহতা,এক নিঃশংসতা দেখতে পায়।সেই রাতে আমাদের দেশের সোনার ছেলেগুলোকে কিভাবে,কতোটা বর্বরের মত পাকিস্তানি খুনি জান্তারা হত্যা করে তা কখনো কেউ কোন ভাষায় বোঝাতে পেরেছিলো তা জানা নেই। মায়ের বুকে লুকানো শিশুটি চিৎকার করে কাঁদে কিন্তু মা যে আর নেই।ওই জন্তুরা যে অনেক আগেই গুলি করে মাকে কেড়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে।এখন মা শুধুই এক শরীর,ওতে ভালবাসা ভরা আত্মাটা আর নেই।সেই রাতে ছোট্ট শিশুকেও ছাড় দেয়নি পশুগুলো।শুনেছি আমার দেশের এক ছোট্ট সাহসী শিশুকে গু্লি করার আগ মুহুর্তেও শিশুটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলছিল "মা বাংলা,জয় বাংলা"।
গর্ব হয় যখন মনে হয় আহ! কি অদ্ভুত সাহসী সন্তানদের দেশেই না জন্ম নিয়েছি এই আমরা।


আসল কথায় ফিরে আসি।যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে আজাদ নিজেকে ধরে রাখতে পারতোনা।সেসময় আজাদের এক দুঃসম্পর্কের মামা এসে জানায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের বিবরণ।রাস্তাঘাট,লঞ্ছ টার্মিনাল সবখানে রক্তাক্ত ভয়াবহতা।ওরা বাঙ্গালির রক্ত চায়....শুধু রক্ত।রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিরাতে ওই পশুরা ধরে নিয়ে আসে অনেক অনেক মা বোনকে।আজাদের মামা সেখানেই থাকতো পুলিশে চাকরি করার সুবাদে।পাকিস্তানি পুলিশ সারারত অপেক্ষায় থাকতো কখন নারী ভর্তি ট্রাক আসবে।সেই সব বন্দি নারী্দের কারো কারো কাধে ব্যাগ ঝুলানো থাকতো।দেখেই বোঝা যেত এরা বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।এরপর......বলতে চাইনা।

আজাদের মামার মত আরো যারা বাংগালী পুলিশ ছিলেন তারা মুখ বুজেঁ কাঁদতো যখন সেই অসহায় নারীদের চিৎকার ধ্বনি শুনতে পেতো।আজাদ শুনতো আর বলতো "এ কী হচ্ছে,এটা হতে দেয়া যায়না"।
মা সাফিয়া বেগমের দুচোখ গড়িয়ে জল নামতো।মায়ের সর্বসময়ের পরামর্শদাতা জুরাইনের পীর বললেন "নারীদের উপর অত্যাচার হইতেছে,এই যুদ্ধ পাকিস্তানিরা জিতবোনা"।
মা আর মায়ের ছেলে আজাদ স্বপ্ন দেখেন,এক সুন্দর দেশের,আপনার আমার বাংলাদেশের।

হঠাৎ একদিন মুক্তিযোদ্ধা কাজী কামাল এর দেখা পায় আজাদ,জানতে পারে তার গেরিলা ট্রেনিং এর কথা।মনে মনে ঠিক করে যুদ্ধে যাবে সে।যুদ্ধকালীন সময় মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকানোর জন্য আজাদদের বাসা ব্যবহার করা হতো।শহিদ জুয়েল,বাচ্চু,কাজী কামাল এমন আরো বীরেরা অপারেশন না থাকলে আশ্রয় নিতে আজাদদের বাসায় উঠতো এবং তাদের বিভিন্ন অপারেশনের গল্প আজাদের সাথে করতো।আজাদ একবার সাহস করে বলে ফেলে "আমিও তোমাদের সাথে যুদ্ধে যাব"।
আজাদ জানতো সে তার মায়ের একমাত্র ছেলে।তবুও সাহস করে সে তার মাকে জানায় "মা তুমি অনুমতি দিলে আমি যুদ্ধে যেতে চাই"।
মা কিছু বললেন না।গেলেন জুরাইনের পীর সাহেবের কাছে।পীর সাহেব বললেন "ওরে যুদ্ধে যাইতে দাও।ও ফিরা আসবো।আর তুমি না করলেও লাভ নাই।দেশের এই অবস্থায় কোনো পোলাই ঘরে বইস্যা থাকতে পারেনা"।
আজাদের মা একথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।পরদিন ছেলেকে বললেন "দেশটাকে স্বাধীন করতে হবে।তুই বাবা যুদ্ধে যা"।
মার অনুমতি পেয়ে শুরু হয় আজাদের যুদ্ধ।


শহীদ জুয়েলের ব্যাপারে কিছু না বলে পারছিনা।যুদ্ধের আগে তার মূল পরিচয় ছিল তিনি একজন ক্রিকেটার।মারদাংগা ব্যাটসম্যান হিসেবে তার বেশ সুনাম ছিল।সবর্দাই হাসিখুশি এই মানুষটি সারাক্ষণই মজার মজার কৌ্তুক করে সহযোদ্ধাদের আনন্দ দিতেন।কোন এক অপারেশনে তার হাতের তিনটি আঙ্গুলে গুলি লাগে।পরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় "খুব কি ব্যথা লাগছে?"।
মহান যোদ্ধা উত্তর দেন "হেভি আরাম লাগতেছে।দেশের জন্য রক্ত দেয়াও হইলো,আবার জানটাও রাখা হইলো।কইয়া বেড়াইতে পারমু দেশের জন্য যুদ্ধ কইরা আঙ্গুল শহীদ হইছে"।
পরবর্তিতে এই মহান মুক্তিযোদ্ধাকে স্মরণ করে চালু করা হয় "শহীদ জুয়েল স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট"।

১৯৭১ সালের ২৯শে আগস্ট,আজাদ ও তার বন্ধুরা আজাদের বাসায়।বাড়ির সবাই যখন ঘুমে তখন পাকিস্তানি হানাদাররা অতর্কিত হামলা চালায় বাড়িতে।ধরে নিয়ে যায় শহীদ আজাদ,শহীদ জুয়েল সহ বেশ কয়েকজনকে।একমাত্র পালিয়ে আসতে পারে কাজী কামাল।আজাদের মা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখেন তার একমাত্র আদরের ধনটিকে কি করে মারতে মারতে তুলে নিয়ে গেল পাকিস্তানি বর্বরেরা তাদের জীপে করে।রক্তাক্ত জায়েদ আর চঞ্চল পরে আছে ঘরের এক কোণায়।মা আর সইতে পারলেন না।চেতনা হারিয়ে মাটিতে মুর্ছা গেলেন।এই ঘটনা যখন বাংগালি বীর সেনা মেজর হায়দারের কাছে পৌছায় শক্তসমর্থ মানুষটি বালিশে মুখ লুকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে বলে উঠেন "মাই বয়েস,মাই বয়েস......"।

শহীদ আজাদকে যে কারাগারে বন্দি রাখা হয় সেখানে শহীদ রুমি,তার ভাই জামী ও পিতা শরিফ ইমাম সাহেবও ছিলেন।সবার উপর কিছুক্ষণ পরপর পাকিস্তানি সৈ্ন্যরা এসে নির্মম নির্যাতন করে যেত।একসময় আজাদের ডাক আসে।অবর্ণাতীত অত্যাচার চালানো হয় তার উপর,কিন্তু কিছুই সে বলেনা।তাকে জিজ্ঞেস করা হয় "তোমার মা বললে সব কথা বলবে?"।
আজাদ মাথা নাড়ে।
এরপর আজাদের বাসায় পাকিস্তানি এক অফিসার অন্য এক রাজাকারকে নিয়ে মা সাফিয়া বেগম এর সাথে কথা বলেন।তাদের কথোপকথন ছিলো অনেকটা এমনঃ

"আপনি আজাদের মা?"
মা বলেন "জ্বী"
"কালকে আপনি রমনা থানায় যেয়ে আপনার ছেলেকে বলবেন যেন সে যা জানে সব বলে দেয়।তাহলে আপনার ছেলেকে আমরা ছেড়ে দেব।ঠিক আছে?"।
"জ্বী"।

পরদিন মা দেখা করতে যান তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের সাথে।আজাদের সারা মুখে,শরীরে অত্যাচারের দাগ দেখে ভিতর ভিতর মায়ের রক্তক্ষরণ হয় কিন্তু তিনি কান্না গোপন করে রাখেন যেন ছেলে কষ্ট না পায়।আজাদ তার মাকে বলেন "মা দুইদিন ধরে ভাত খাইনা।তোমার হাতের ভাত খাইতে ইচ্ছা করছে।কালকে একটু ভাত নিয়া আইসো"।
মা জিজ্ঞেস করেন "তুমি কি তোমার বন্ধুদের খবর ওদেরকে বলে দিয়েছ?"

আজাদ বলে "ওরা অনেক মারে মা,আর জানতে চায় সবার কথা।আমি কিছু বলিনাই"।

জাহানারা ইমাম যেমন তার ছেলে রুমিকে বলেছিলেন "যা তোকে দেশের জন্য কুরবানী দিলাম",সাফিয়া বেগম যুদ্ধে যাওয়ার সময় আজাদকে এমন বলতে পারেন নাই।তার যে একটি মাত্র সন্তান,এই একটা বুকের ধন ছাড়া আর যে কেউ নাই তার।কিন্তু সেদিন জেলখানায় মা বুকে পাথর বেঁধে বললেন "যখন ওরা মারে তখন শক্ত হয়ে থেকো।তোমার বন্ধুদের কথা বলোনা"।

পরদিন মা যান তার ছেলের জন্য ভাত নিয়ে।কিন্তু ছেলেকে আর পাননা।রমনা থানা,তেঁজগাও থানা দুদিন ধরে হাতে ভাত নিয়ে তিনি ছেলের খোঁজে ঘুরতে থাকেন কিন্তু ছেলেকে আর পাননা।একসময় দেশ স্বাধীন হয়।সবাই বলে আজাদ শহীদ হয়েছে।কিন্তু মায়ের মন মানতে পারেনা।তিনি বিশ্বাস করেন,আজাদ আসবে ফিরে,বুকের ধন বুকে ফিরে আসবেই।জুরাইনের পীর সাহেবও বলেন "আজাদ ফিরা আসবো"।

এভাবেই অপেক্ষা করতে করতে ১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট মায়ের জীবনাবসান হয়।এর ঠিক ১৪ বছর ১ দিন আগে ১৯৭১ এ আজাদকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে যায়।

এই ১৪ বছর মা একটিবারও ভাত মুখে দেননি।রুটি খেয়েছেন,পাউরুটি পানিতে ভিজিয়ে খেয়েছেন,কিন্তু ভাত কখনোই নয়।কারণ তার আদরের ছেলেটি যে ভাত চেয়েও খেতে পারেনি।

এই ১৪ বছর মা একটিবারও বিছানায় মাথা দেয়নি।নিচে শুয়ে রাত পার করে দিয়েছেন,বালিশের বদলে মাথায় দিয়েছেন পিঁড়ি।কারণ তিনি দেখেছেন তার আদরের ছেলেটি কি করে বন্দিখানায় নোংরা মাটিতে শুয়ে ছিল।

এই ১৪ বছর মা অনেক কষ্ট করে দিনযাপন করতেন।একটি বস্তিবাড়িতে খেয়ে না খেয়ে থেকেছেন।সন্তানের বউয়ের জন্য ১০০ ভরি গয়না রেখে দিয়েছিলেন পরম যত্নে,যদি সন্তান ফিরে আসে এই আশায়।কখনো তাতে হাত দেন নাই।

মৃত্যুর আগে তার ভাগ্নেকে বলে গিয়েছিলেন "আমার কবরের উপর লিখে রেখ আজাদের নাম,আর কারো নয়।"

অনেকে বলেছিল স্বামীর নাম দেয়ার জন্য,কিন্তু জায়েদ তা হতে দেয়নি।মা যা বলেছে ঠিক তাই করা হয়েছে।আপনারা কেউ যদি জুরাইনের কবরস্থানে যান তাহলে মায়ের শ্বেতপাথরে সাজানো কবরের উপর লিখা পাবেন "শহিদ আজাদের মা"।

মারা যাওয়ার আগে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম মাকে বলেছিলেন তাকে নিয়ে লিখালিখি করবেন।মা রাজী হোন নাই।মা এইসব প্রচার প্রচারণা পছন্দ করতেন না।


এই লিখাটা লিখেছিলাম কোন এক গভীর হাতে আজ থেকে বছর তিনেক আগে।লেখক আনিসুল হকের মা বইটা পড়ে মনে হয়েছিলো একটু ছোট্ট করে সবাইকে এই মায়ের কথা জানানো দরকার। কারণ একটি চিঠি যাতে আজাদ লিখেছিল,

"মা তুমি কখনো আমাকে একটুও মারোনি।তোমার মত মা কি আর হয়।আমি যদি কখনো অনেক বড় হই সেদিন তোমার কথা সবাইকে জানাবো।"

আমি যখন প্রথম মা বইটি পড়ি আজ থেকে তিন বছর আগে তখন নিজেকে মনে হচ্ছি্ল এই মায়েরই একজন সন্তান।কেননা এমন মায়েদের জন্যই তো আজকে আমি এই দেশে,স্বাধীন বাংলার পিচঢালা রাস্তায় হেটেঁ চলতে শিখেছি।তাই উনি শুধু শহীদ আজাদ নন আমাদের সকলের মা।মাকে যারা কাছে পেয়েছিলেন তারা সবাই উনাকে ডাকতেন "আম্মা" বলে।কেননা মা যেভাবে সবার দিকে খেয়াল রাখতেন,অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের যত্ন করতেন তা উনাকে একজন চিরন্তন মমতাময়ী মায়ের মতই ইতিহাস এঁকে রেখেছে।

আবারো জানাচ্ছি আমার এই লিখাটি সম্পূর্ণই লেখক আনিসুল হকের "মা" থেকে নেয়া।লেখার সুবিধার্থে কিছু অংশে নিজের মত ভাষা ব্যবহার করেছি।আসলে বইটি পড়ে কেন যেন আমি নিজের মধ্যে শহীদ আজাদকে দেখতে পাচ্ছিলাম।দেশের এই সেরা সন্তানটি আমাদের বাংগালী সবার মাঝেই হয়ত লুকিয়ে আছে।গর্ব হয় যখন মনে হয়,শহীদ আজাদ তো আমারই এক ভাই।তাই মায়ের কথা বলার যে স্বপ্ন আজাদ দেখেছিলেন,লেখক আনিসুল হকও তা দেখেছিলেন,লিখাটি পড়ে আমিও তাই দেখতে চাইলাম।

আবারো বলতে চাই একজন,শুধু একজন মানুষকেও যদি জানাতে পারি আমাদের এই মমতাময়ী মায়ের কথা আমি সার্থক।


সাদ আহাম্মেদ

সখি ভালবাসা কারে কয়

রামিম আহমেদ আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে অপরিচিত চেহারা । ফার্ষ্ট ইয়ার ফাইনালে মেধাতালিকায় প্রথম স্থানে তার নাম দেখে সবার চোখ অক্ষিকোটর থেকে বের হয়ে পড়ে যাবার অবস্থা । এই ছেলের নাম এর আগে কেউ কখনো শুনেনি । কিছুদিন হলো সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হয়েছে । জীব বিজ্ঞান ক্লাসে পেছনের দিকের সীটে বসে রামিম মনযোগ দিয়ে কবিতা লিখছে । শিরিন ম্যাডাম ক্লাস নিচ্ছেন । ক্লাসে পিন পতন নিস্তব্ধতা । হঠাত্‌ শিরিন ম্যাডাম ডেকে উঠলেন .........
'' এই ছেলে , তুমি , হ্যা হ্যা তুমি ; দাঁড়াও । ''
মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে পড়লো রামিম । মনে মনে দুয়া ইউনুস পড়া শুরু করে দিল সে । না জানি কি-না কি হয় আজকে । শিরিন ম্যাডাম কে ক্লাসের সবাই খুব ভয় পায় । উনাকে ভয় পাওয়ার যতেষ্ট কারন আছে , উনি তিল কে তাল না , তিল কে তিলোত্তমা বানিয়ে ছাড়েন ।
- কি নাম তোমার ?
-- রামিম ।
- ক্লাসের সেই শুরু থেকে দেখছি খাতায় কি জানি লিখেই যাচ্ছ । কি লিখছিলে ?
-- কিছু না ম্যাডাম । এমনি...
- দেখি , খাতা নিয়ে এখানে আস ।
ক্লাসের সবাই চাপা স্বরে কথা বলা শুরু করে দিল । রামিমের পৃথিবী রিক্টার স্কেলে ১০ এর কাছাকাছি মাত্রায় দুল খেল । এ রকম সিচুয়েশনে ওর খালি হিসু আসে ; এখনো হিসু পাচ্ছে । সে মনে মনে দোয়া করছে , ম্যাডাম যেন আজকে তিল কে এটলিষ্ট কাঁঠাল পর্যায়ে হলেও রাখেন । বেশ কয়েক বার মনে মনে বললো , '' মা ধরিত্রী দ্বিধা হও '' ।
শিরিন ম্যাডাম মিটমিট করে হাসছেন । আনমনে বলেই ফেললেন , ' বাহ ! তোমার হাতের লেখাতো বেশ চমত্‌কার ' । এর পর শিরিন আপা তাই করলেন , যার ভয়ে অস্থির হয়ে ছিল রামিম । প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে রামিমের খাতায় লেখা ছোট ছোট কবিতাগুলো বড় করে পড়তে শুরু করলেন ।

    ফিরে গেছে ডাকপিয়ন ,
    তুমি শুনলে না তখন ।
    নীলাভ খামের ডাক / তবে স্বযতনে তোলা থাক ।
    বেহায়া ভালবাসা, চিনে এসেছে বাসা, পৌঁছে যাবে ঠিক ঠাক ।

ক্লাসে হাসির ধুম পড়ে গেল । রামিমের সেদিকে খেয়াল নেই এখন । কারন সে বেহায়ার মত তাকিয়ে আছে জয়ন্তীর দিকে । জয়ন্তী হাসছে । জয়ন্তী বড়ুয়া ; তার ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে । ভুল , জয়ন্তী এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী । সে হাসছে । রামিমের কাছে মনে হল জয়ন্তীর হাসির বিভায় সূয্যি মামা কিছুটা লজ্জা পেলেন ।
- কার লেখা কবিতা ?
রামিম সংকোচের সাথে বলল ,
-- ম্যাডাম , আমার ।
- তোমার ! বেশ ভাল লিখেছ । কিন্তু জীব-বিজ্ঞান ক্লাসে কবিতা চর্চার অপরাধে তুমি আজ পুরা ক্লাস বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে থাকবে , যাও ।
সেদিন রামিম পুরাটা ক্লাস বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে ছিল । এরপর টানা ১ সপ্তাহ সে ক্লাসে যায় নি । প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হতো , আর সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে বসে থাকতো । ভেবেছিল কোনদিন কলেজে যাবে না আর । কিন্তু জয়ন্তীর সাথে যে তার দেখা হয়না , সেটাই হলো প্রব্লেম । এই কয়দিন প্রতি সন্ধ্যায় সে জয়ন্তীদের বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল । এই কাজটা সে প্রতিদিনই করে অবশ্য । জয়ন্তী মাঝে মাঝে বেল্কনীতে আসে । অন্ধকার রাস্তায় সে রামিমকে দেখতে পায় না । কিন্তু রামিম ঠিকি জয়ন্তীকে দেখে ।
খুব তুচ্ছ কারনে জয়ন্তীর মনটা খারাপ হয়ে আছে । কারনটা তুচ্ছ হলেও এর প্রভাব কিন্তু ব্যাপক । আজ সারাটা দিন ভুগতে হবে তাকে । এরকম প্রায়ই হয় তার । আজ যা-ই ঘটবে , সেটাতেই সে বিরক্ত হবে । তার উপর কখন থেকে সে অপেক্ষা করছে নকিব আর সামান্তা'র জন্য । অথচ ওদের কোন হদিস নেই । শিশু একাডেমীর নীচ তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জয়ন্তী বিরক্তির চুড়ান্ত সীমায় পৌছার ঠিক একটু আগেই সে দেখলো উপর থেকে রামিম নামছে । জয়ন্তী কিছুটা বিব্রত হলো । রামিম জয়ন্তীকে দেখেনি , অন্যপথে চলেই যাচ্ছিল । হটাত্‌ পেছেন থেকে জয়ন্তী রামিম বলে ডাক দিল । পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখে জয়ন্তী তার নাম ধরে ডাকছে । সে তার কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না । রামিমের মনে হল হঠাত্‌ পৃথিবীর আহ্নিক গতি - বার্ষিক গতি বোধয় বেড়ে গেছে । সূর্য আরো কাছে নেমে এসেছে কয়েক আলোকবর্ষ । নয়ত এর মধ্যেই সে কেন এমন করে ঘামছে ! তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে ভয়াবহ অবস্থা ।
- তোমার নামতো রামিম, তাই না ?
-- হ্যা ; ভাল আছো জয়ন্তী ?
- ভাল । তুমি এখানে ? কারো সাথে দেখা করতে এসছো ?
-- না না , শিশু একাডেমীতেই একটা কাজ ছিল ।
- আমি নকিব আর সামান্তার জন্য অপেক্ষা করছি । ওদের আসার কোন নাম গন্ধ নেই । আচ্ছা , তুমি এই কয়দিন কলেজে আসনি কেন ? শিরিন ম্যাডাম খুঁজছিলেন তোমাকে ।
-- তাই ! না আসলে শরীরটা খুব একটা ভাল ছিল না । আর তাছাড়া বেশ লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন । ভেবেছিলাম আর কোনদিন কলেজে যাব না ।
জয়ন্তী আর রামিমের কথা আর বেশী দূর আগায় না । রিক্সা থেকে নেমে সামান্তা প্রায় দৌঁড়ে ওদের কাছে এলো ।
'' সরি দোস্ত দেরী হয়ে গেল । ঐ নকিব গাধাটার জন্যই দেরী হলো । তা, আমাদের হেলাল হাফিজ কে কই পেলি ? '' সামান্তার কন্ঠে রাজ্যের উচ্ছাস ।
জয়ন্তী রামিমের প্রশ্নবোধক চিহ্ন মার্কা দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারলো না , বলেই ফেললো '' ও হ্যা , কলেজের ঐ দিনের ঘটনার পর সামান্তা তোমার নাম দিয়েছে হেলাল হাফিজ । ''
রামিম কিঞ্চিত লজ্জা পায় । মুখে সৌজন্যমুলক হাসি ।
'' আচ্ছা , আজ তাহলে আমি চলি । তোমরা মজা কর । দেখা হবে অন্য কোন দিন । '' রামিম কিছুটা ব্যস্ততা দেখায় ।
'' চলি মানে ! আজকে আমার জন্মদিন । আর তুমি আমাদের সাথেই যাচ্ছ । '' সামান্তা অনেকটা অধিকার নিয়েই বলে ।
'' তাই নাকি ! হ্যাপি বার্থ ডে ; তোমার জীবন হউক সজিনার ফুলের মত সুন্দর । কিন্তু আজ যে আমাকে যেতে হয় , ইম্পর্টেন্ট একটা কাজ ছিল । ''
সামান্তা : কোন ভাবেই না ।
জয়ন্তী : চল আমাদের সাথে , বেশিক্ষণ থাকবো না এম্নিতে আমরাও ।
জয়ন্তীর ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা কিংবা সাহস কোনটাই রামিমের ছিল না । বরং তার কাছে পুরো বিষয়টা এখনো ঘোরলাগা । সে নিজেকে , এই অপরাহ্ন কে বিশ্বাস করতে পারছে না ঠিক মত । ওরা তিনজন হাঁটতে থাকে ।
শিশু একাডেমীটা বেশ চমত্‌কার একটা জায়গায় । সামনে সারি সারি ঝাউবন যেখানে দৃষ্টি আটকে যায় । আর দৃষ্টির সীমানা পার হলেই অন্য কোন পৃথিবী যেন । অথৈ জলধারা , দীর্ঘতম সমুদ্রের অসমাপ্ত বেলাভূমি ।
একঝাঁক তরুন তরুনী হাঁটছে সাগরতীর ধরে । সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে তাদের চিত্‌কার , হাসাহাসিতে মুখরিত ছিল সেদিনের বিকেল । রামিম বেশ শান্ত , একা একাই হাঁটছে । তাদের অনেকের সাথেই তার তেমন সখ্যতা নেই । জয়ন্তী তার পাশে চলে আসে । পাশাপাশি হাঁটছে তারা দুইজন । প্রকৃতি তাদের দুজনকে কাছাকাছি আসার একটা সুযোগ করে দেয় । সেই বিকেলের সব কটা মুহুর্তই যেন অপার্থিব ।
- '' তুমি বেশ চুপচাপ ; আমরা মনে হয় তোমাকে বিব্রতকর আবস্থায় ফেলে দিলাম । ''
রামিম হাসে ।
-- জয়ন্তী , তোমাকে একটা কথা বলবো বলে ভাবছিলাম । কিন্তু কিভাবে বলি ; বা বলা উচিত হবে কিনা তাও জানি না ।
- খুব খারাপ কিছু কি ? তাহলে বলোনা - জয়ন্তীর হাসিতে প্রশ্রয় ।
-- না, এমন কিছু না । আচ্ছা বলেই ফেলি ।
'' তুমি স্বপ্ন দেখ ? ''
জয়ন্তী বেশ অবাক দৃষ্টিতে রামিমের দিকে তাকায় । যেন এমন অদ্ভুত প্রশ্ন সে আগে কোনদিন শুনেনি ।
- এটা কেমন প্রশ্ন । সবাই স্বপ্ন দেখে , সবার নিজস্ব কিছু স্বপ্ন থাকে ।
-- হুঁ , সত্যি । আমিও দেখি । পার্থক্য হল , আমি আমার দেখা স্বপ্ন হুবাহু যাপন করছি ।
- মানে কি ? বুঝলাম না ।
-- আমি দিনের পর দিন , অবিশ্রান্ত নিজের ভেতর একটা স্বপ্ন সাজিয়েছিলাম অবিকল এমন একটা বিকেলের । আমার ধুসর পান্ডুলিপিতে লিখে রেখেছি সব । তুমি বিশ্বাস করবে না জানি , তারপর ও বলি । শুধু এটুকু আলাদা ,আমার স্বপ্নে তুমি শাড়ি পড়ে আস । তোমার খোলা চুল বাতাস এলোমেলো করে দেয় । তোমার চোখে মুখে চুল । তোমার চুলের ঝাপ্টা কিছুটা আমার গালেও পড়ছে । এমন সুখদায়ক বাতাসী যন্ত্রনায় কিঞ্চিত বিরক্ত হও তুমি । আমি গল্প বলি , তুমি হাসতে হাসতে ভেঙ্গে পড় । তোমার হাসির আওয়াজ আমার ভেতর এই রকম ফেনীল ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ে । হঠাত্‌ ধমকা হাওয়ায় আমার চোখে বালি পড়ে । আর তুমি তোমার আঁচলের ভাপ দিয়ে মুছে দাও ।
রামিম আর কোন কথা বলে না । জয়ন্তী কিছুটা বিব্রত হয়ে চুল গুছাতে থাকে । এরপর দু'জনেই চুপ চাপ । তারপর হঠাত্‌ রামিম ,'' may be i should go '' বলে কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই উল্টা পথে হাটতে থাকে । জয়ন্তী কিছু বুঝে উঠার আগেই সে অনেক দূর চলে যায় ।
জয়ন্তী কলেজে এসেই মনে মনে রামিমকেই খুঁজছিল । কিন্তু তার কোন খবর নেই । গতকাল কি সব বলে গেল , জয়ন্তীর সারাটা রাত কেটেছে এলোমেলো ভাবনায় । '' আশ্চর্য্য ছেলে তো ! আজকেও কি কলেজে এলো না । '' মনে মনে ভাবতে থাকে জয়ন্তী । এসব ভাবতে ভাবতে কলেজের যাত্রী ছাউনির দিকে হাঁটতে থাকে সে । একটু পরে বাস এসে যাবে । সামান্তারা খুব চিত্‌কার চেঁচামেচি করছে । হঠাত্‌ জয়ন্তী পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে রামিম দাঁড়িয়ে আছে । জয়ন্তী কিছুই বলে না । রামিমের হাতে তার ডায়রী , ধুসর পান্ডুলিপি । রামিম জয়ন্তীর দিকে সেটা বাড়িয়ে দেয় । জয়ন্তী বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে , '' কি ওটা ? "
- ধুসর পান্ডুলিপি ।
-- তো আমাকে দিচ্ছা কেন ?
- তোমার জন্য । প্লিজ নিয়ে যাও । পছন্দ না হলে ফেলে দিও ।
-- ক্লাস করোনি কেন ?
- করেছি । পেছনে বসে ছিলাম । তুমি খেয়াল করনি ।
এর মধ্যে বাস চলে আসে । জয়ন্তী বাসে উঠে যায় । রামিমের ডায়রীটা ব্যাগে ঢুকাতে গিয়ে সামান্তা দেখে ফেলে । শুরু হয় মেয়েলি কথাবার্তা । জয়ন্তীর ওদিকে একদম মন নেই । তার কৌতুহল, কি আছে ঐ ডায়রীতে । জয়ন্তীর তাড়া কখন বাসায় যাবে সে , কখন পড়বে সেটা । অতএব , বাসায় পৌঁছে সে তার রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয় । ডায়রী খুলেতেই দেখলো একটা নীল খাম । জয়ন্তী খাম খুলে চিঠি পড়তে শুরু করলো ।

   " জয়ন্তী ,
    মনে হয় বেশ অস্বস্থির মধ্যে ফেলে দিলাম তোমাকে । এই ভয়টাই ছিল আমার । আমি চাইনি আমার স্বপ্ন , আমার বিষন্নতা কখনো তোমার স্বাভাবিক জীবনকে আন্দোলিত করুক । তাই গত এক বছরে তুমি কখনোই জানতে না রামিম নামের কেউ তোমার ক্লাসে পড়ে । আমি প্রতিদিন তোমাকে দেখেছি , ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজিয়েছি তোমাকে । আমার ভেতর কেমন লুকিয়ে থাকো তুমি । যেন জলের মধ্যে মিশে থাকা জল রঙ আলো । আমি প্রতিদিন তোমার বাসার সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি , তোমাকে দেখবো বলে । তুমি মাঝে মাঝে বারান্দায় আসতে । আমি তোমাকে দেখতাম , কিন্তু অন্ধকারে তুমি কখনোই আমাকে দেখনি ।
    জয়ন্তী , আমি জানি না আমার কেন এমন হলো ? কেন আমার দিন কাটে না , না রাত কাটে । কেন আমার অনুভুতিগুলো কেবল তোমার সূর্যমূখীর মুখাপেক্ষি ? কেন আমার প্রতিটা সন্ধ্যা নামে তোমার উঠোনে ? তুমি কিভাবে জানবে , এত কিছুর জবাব আমি নিজেই জানতে পারিনি । সেদিন যে স্বপ্নের কথা বলেছিলাম , সেই স্বপ্ন প্রায়শঃ আমার মাথার ভেতর ঘুরে উঠে । আমার বুকের চারপাশে ঘুরে । আমি তাকে এড়াতে পারি না ।
    তোমাকে দেখার পর থেকে আমার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল । প্রথম প্রথম মনে হত এটা একটা মোহ ; মায়া । তোমাকে নিজের কাছ থেকে আড়াল করে রাখলে মনে হয় এই মোহ কেটে যাবে । তাই ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম । ম্যাথ প্রব্লেম সল্‌ভ করতে লাগলাম । রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞানে কন্সেন্‌ট্রেট করতে শুরু করলাম বেশী করে । কিন্তু লাভ হলো না । যেটা হলো তা হল অনিদ্রা রোগ । পাতার পর পাতা চিঠি লিখতে শুরু করলাম ।
    জয়ন্তী , আমি বিশ্বাস করি প্রকৃতি নির্দিষ্ট কোন কারন ছাড়া কিছুই করে না । কিন্তু তাই বলে প্রকৃতির এই বাঘবন্দি র খেলায় আমি হেরে যেতে চাই না । আমি তোমার খুব কাছে যেতে চাই । আমাকে তোমার ভেতর আবিষ্কার করতে চাই । তোমাকে নিদারুন ভালবেসে যেতে চাই । শিমুল তুলার মত তোমাকে নিয়ে উড়ে যেতে চাই মেঘেদের দলে মিশে । আমি চাই ,ভীষন জ্বরে আমার গা পুড়ে গেলে তোমার হাত খানি আমার কপালে রাখো ।
    পুনশ্চ ; যদি পার কাল একবার দেখা করো । শিশু একাডেমির নীচে থাকবো আমি বিকেল ৪ টায় ।"

জয়ন্তী চিঠি রেখে , ডায়রীর পাতা উল্টায় একটার পর একটা । তার নিশ্বাস ভারী হয়ে আসে । সমুদ্র পাড়ের মেয়ে , তাই সমুদ্রের লোনা ঢেউ আছড়ে পড়তে চায় চোখের পাতায় । এর পর কে রোধে তার অবিরাম স্রোত ! সারাটি রাত ডায়রীর পাতাগুলোর সাথে তার মনের কথা হয় । দ্বিধার স্তুপ বাড়তে থাকে । তারও স্বপ্ন ছিল একসময় এমন করে কেউ তাকে ভালবাসবে । রামিম বেসেছে । যে ভালবাসা উপেক্ষা করার ক্ষমতা ঈশ্বর তাকে দেয় নি । যে উপেক্ষা করতে পারবে , সে হয় দেবী না হয় পাথর । জয়ন্তী দেবী ও নয় , পাথর ও নয় । সাধারন একটা মেয়ে । এতই সাধারন যে ধর্ম তার সামনে আজ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে । ছোট শহরের মেয়ে হয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একটা ছেলেকে ভালবাসা নেহায়েত স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয় । যার সাথে বাস্তবতার যোজন যোজন দূরত্ব । কিন্ত, '' প্রেম একবার এসেছিল নীরবে ......... '' এই একটা গান শুনে সারা জীবন কাটাতে চায় না সে । অতঃপর রাত শেষে জয়ন্তী তার জীবনের সবচে কঠিন সীদ্ধান্তটা নেয় ।
সেদিন পৃথিবীটা কেমন ছিল তার খবর কেউ রাখেনি । প্রতিদিনের মত আকাশ নীল ছিল , নাকি ঈষৎ গোলাপী হয়ে উঠেছিল তা কেউ খেয়াল করেনি । শুধু রামিম জানত আর করুণাময় জানতেন সেদিন পৃথিবী ব্যাপক আয়োজনে সেজেছিল । জয়ন্তী এসেছিল সেদিন । দেবী কিংবা রাজকন্যা নয় , সাধারন অন্য যে কোন নারীর মত ।
জয়ন্তী ধিমি ধিমি পায়ে হেঁটে আসছে । রামিম অপলক তাকিয়ে আছে সেদিকে । তখন তার পলকে দারুন ঝলকে ভরে উঠে জল । হৃদয় দোলা দিয়ে উঠে । তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ...............

    তোমাকে, শুধু তোমাকে চাই, পাবো?
    পাই বা না পাই এক জীবনে তোমার কাছেই যাবো ।
    ইচ্ছে হলে দেখতে দিও, দেখো
    হাত বাড়িয়ে হাত চেয়েছি রাখতে দিও, রেখো
    অপূণতায় নষ্টে-কষ্টে গেলো                         
    এতোটা কাল, আজকে যদি মাতাল জোয়ার এলো
    এসো দু’জন প্লাবিত হই প্রেমে
    নিরাভরণ সখ্য হবে যুগল-স্নানে নেমে ।
    থাকবো ব্যাকুল শর্তবিহীন নত
    পরস্পরের বুকের কাছে মুগ্ধ অভিভূত ।




-yeaseer arafat

রাস্তার এপারে আর ওপারে

বাসার সবাই দেশের  বাড়িতে গেছে। এদিকে আমাদের কলেজে আবার সাইন্স ফেয়ার  শুরু হবে। তাই আমি যাই  নাই।ফ্রেন্ডের বাসায় থাকবো। ভিকারুননিসানুন আসবে,হলিক্রস  আসবে,বিএএফ শাহীন আসবে।আমাদের  তো তখন পাঙ্খা অবস্থা।আমরা  কলেজের মোটামুটি সবচেয়ে বদ ব্যাচ।ক্লাস মিস থেকে শুরু করে ভাইস প্রিন্সিপালের  সাথে দাড়িয়াবান্ধা খেলার  অভিজ্ঞতাও আছে কারো কারো।হুট করে সাইন্স ফেয়ারের কথা শুনে আমরা সবাই চরম সিরিয়াস।নিয়মিত ক্লাসে ঢুকি। বড়ভাইদের সালাম দেই।এমন করতে করতে সাইন্স ফেয়ার শুরু হয়ে গেলো। ফালু সাহেব উদ্বোধন করলেন। আমি স্কাউটে নাই। হুট করে মাথায় স্কাউট এর ফ্রেন্ডদের মধ্যে একজনরে বললাম,আমি থাকবো ভলান্টিয়ারে।বন্ধুতো টাশকী!!!!কাহিনী কি!!অনেক কষ্টে,কাহিনী ঝামেলা শেষ করে ঢুকলাম ভলান্টিয়ার গ্রুপে।আমি আর অদিতি।আমাদের দিলো সরকারী বিজ্ঞানের নতুন বিল্ডিঙ্গের ২তলায়।বাইরের থেকে ছেলেদের স্কুল আসছে ওই রুমে। মেজাজ খারাপ।এইজন্য কি ভলান্টিয়ার হইছি নাকি?অদিতিকে বললাম,দোস্ত কিছু কর।লাঞ্চ এর সময় স্কাউট গ্রুপের বড় ভাইকে গিয়ে ধরলাম।বললাম ৩তলায় ভিকারুননিসার রুমে দিতে হবে আমাদের।কিছুক্ষন কথাবার্তার পরে ভাইয়া রাজি হলো।শুরু হলো আমার কাহিনী প্রথম ধাপ।

লাঞ্চের পরে গিয়ে ঢুকলাম ভিকারুননিসার মেয়েরা যেই রুমে ছিলো সেই রুমে। আমি আর অদিতি তো পুরা ভাবে আছি।এরমধ্যে দেখে নিচ্ছি চারপাশ।হঠাত করেই চোখে চোখ পড়লো। Eyes-u eyes-u meet-u meet-u অবস্থা ।প্রথমে বুঝতে পারি নাই।কিছুক্ষণ পরে আবার তাকালাম।একই কাহিনী।অদিতিকে কাহিনী বললাম।ও বললো,চালাইয়া যা।প্রথম দিন এইভাবে শুধু আমারই মনে একটু উত্থাল-পাত্থাল শুরু হইলো(পরে তার কাছে শুনেছি তিনি নাকি প্রথম দিনে কিছুই দেখেননি)।রাতে ফ্রেন্ডের বাসায় তো আমার আর ঘুম আসে না।ওরা ৩জন থাকত ওর রুমে।২টার দিকে বসলাম কার্ড খেলতে।খেলতে খেলতে ভোর।নাস্তা করতে বের হলাম।এসে ছোট্ট একটা ঘুম দিয়ে নিলাম।কিছুক্ষণ পরেই উঠে দৌড় দিলাম কলেজে। গিয়ে সাথে সাথে ৩তলায়।আগের রুমেই।দেখলাম তিনি এসে পড়েছেন। অনেকে আসছেন।প্রজেক্টের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে। তিনি কথা বলছেন।মাঝে মাঝে মনে হয় আমার দিকেও একটু তাকাচ্ছেন।আমি তো ভলান্টিয়ারের কাজ ছেড়ে সব ভুলে তার টেবিলের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকি।মনে নেই,কি যেন একটা সমস্যা হচ্ছিলো।আমাকে বললো অনেকক্ষন পরে।আমি তো হাতে চান্দের বাত্তি পাইলাম।যা যা করা লাগে করলাম।এরমধ্যেই দুপুর হয়ে গেলো।স্যার এসে বলে গেলো,লাঞ্চের সময় থেকে শুরু করে যতক্ষণ না পর্যন্ত স্যাররা বলবেন ততোক্ষন পর্যন্ত রুমের দরজা বন্ধ থাকবে এবং মেয়েরা সবাই রুমের ভেতরে থাকবে।কেউ বের হবে না,কেউ ঢুকবেও না। জানিয়ে দিলাম সবাইকে।ওহ।আমাদের দুইজন মানে আমার আর অদিতিরও রুমের থেকে বের হওয়া চলবে না। ঠিক আছে।সবচেয়ে বিরক্তিকর পরিস্থিতে তখন।

রুমে শুধু আমরা দুইটা ছেলে।আর বাকি সব মেয়ে।খালি চিৎকার,চেঁচামেচি......হুট করেই দেখলাম করিডরে একটা ছেলে হাটাহাটি করছে।আমাদের জানামতে তখন পুরা বিল্ডিং বন্ধ।কেউ ঢুকতে পারা কথা না।দেখলাম ছেলেটা তাদের টেবিলের দিকে আসার চেষ্টা করছে। ছেলেটা দরজার কাছাকাছি আসতেই আমি গেলাম।আমাকে বললো ভেতরে ঢুকতে চায়।আমি বললাম,ভাইয়া এখন তো প্রজেক্ট শো বন্ধ। আপনি কিছুক্ষণ পরে আসেন।এরমধ্যেই তিনি এগিয়ে আসলেন আমার দিকে।পেছন থেকে ডাক শুনে ঘুড়ে দাড়ালাম।কিন্তু পড়ে যাওয়ার অবস্থা হলো আমার।তিনি কথা বলতে আসছেন আমার সাথে। বললেন যেই ছেলেটি আসছে সে তাদের এক ফ্রেন্ডের বড় ভাই। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে তার কথা শুনলাম।বললাম,আপু আমাদের কিছু করার নেই।উনি বললেন,দেখেন না ভাইয়া কিছু করা যায় কিনা।আমি বললাম,ঠিক আছে।দেখছি।একবন্ধুকে ডাক দিলাম।তাকে বললাম ছেলেটিকে পুরো ফেয়ার ঘুড়িয়ে দেখাতে। কেউ কিছু বললে যাতে বলে একজন কম্পিটিটরের ভাই। সেই বড় ভাই(!) কে নিয়ে আমার বন্ধুটি গেল।আমি তো তখন উড়তেছি। তিনি বললেন থ্যাঙ্কস।সবাই থ্যাঙ্কস দিলো তাদের টেবিলের।

আমাকে আর পায় কে। এতক্ষণে ইনফিল্ট্রেট করার চান্স পেলাম।এরপরে কিছুক্ষণ পরপরই তাদের সামনে যাই,তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। এর মধ্যেই স্যার এসে বলে দিলো রুম ওপেন করে দিতে।অনেকক্ষণ বন্ধ থাকার ফলে তখন পানির মত ছেলেরা ঢুকতে লাগলো।আমার আর অদিতির তো মাথা খারাপ অবস্থা।এরপরেই সেই কাহিনী......কোন একটা স্কুলের এক ছেলে একটা প্রজেক্টের মেয়েদের কমেন্টের ডায়রীতে খারাপ কিছু লেখে সম্ভবত। মেয়েরা তাদের মিস কে কথাটা জানায়।রীতিমত গন্ডগল লেগে যায়।আমি আর অদিতি যাওয়ার পরে মেয়েরা আমাদের জানালো।এরপরে আমি কলার ধরে ছেলেটাকে টেনে নিয়া আসলাম আর অদিতি হাল্কা দুই একটা দিতে থাকলো(কি দিলো তা নিশ্চই আর বলতে হবে না)। মারামারি দেখে যে মেয়েদের টেবিলে ঘটনা হইছে তাদের একজন হঠাত নাই হয়ে গেলো।মানে অজ্ঞ্যান।আমাদের তো মাথায় বাড়ি।অদিতিকে ছেলেটার ব্যবস্থা করতে বলে আমি আবার ফিরে আস্লাম।

এসে দেখি সবাই পানি পানি বলে চিৎকার করছে কিন্তু এতোগুলো মেয়ে কারো কাছেই পানি নেই। আঙ্কেল(আরেক বন্ধু) কে পাঠালাম পানি আনতে। পানি আসলো।ছিটানো হলো মেয়েটার মুখে। সুস্থ হলো।এতক্ষণে আরেকদিকে তাকানোর কথা খেয়ালই ছিলো না।হুট করেই তাকিয়ে দেখি তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।আবার একটা হার্টবিট মিস করলাম।এরপরে আসলাম তাদের দিকে।জিজ্ঞেস করলাম তারা ঠিক আছে কিনা।কিছু দরকার কিনা।বললো না।আবারো থ্যাঙ্কস পেলাম তাদের থেকে।এরপর টুকটাক কথা চলতে থাকলো।তখনো নাম জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না।এরমধ্যেই ২য়দিন শেষ।আজকের দিনের ফলাফলে আমি সন্তুষ্ট।পারলে সংবাদ সম্মেলন করি টেষ্ট খেলা অধিনায়কের মত ২য়দিনের সাফল্যের কথা ভেবে।এইদিন আর বাসায় গেলাম না।অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম সেজান পয়েন্টে।আড্ডা দিয়ে ১১টার দিকে ফ্রেন্ডের বাসায়।ওরে আপডেট দিলাম।অপেক্ষার রাত......কখন শেষ হবে আল্লাহ মালুম!!!!!

কোনমতে রাতটা পার হলেই আমি পুরা উসাইন বোল্টের মত দৌড় দিলাম মিরপুর থেকে।কলেজে ঢুকে ব্যাগটা রেখেই খোজ নিলাম তিনি আসছেন কিনা।ততক্ষণে আমাদের পুরা সার্কেলে খবর হয়ে গেছে।“বাবু আটকাইয়া গেছে বড়শীতে”। কিছুক্ষণ পরেই তারা আসলেন।আমার তো অবস্থা খারাপ।আজকেই ফেয়ার শেষ,কিছু একটা করতেই হবে।কিছু একটা বলতেই হবে।এরমধ্যেই বনি বাজি ধরলো।এক প্যাকেট সিগারেট।আমি নাকি মেয়েটার সাথে কথাও বলতে পারবো না।মাথা তো আরো খারাপ। এরমধ্যেই গেলাম তার সামনে।কথা হলো টুকটাক। কিছুক্ষন পরে বেরসিকের মত ফালু সাহেব এসে পড়লেন।মানে সময় শেষ।সবাইকে কলেজের অডি তে যাওয়ার জন্য বলা হলো।আমি তো আর যাই না।তাদের সাথে সাথে গেলাম। তিনি গিয়ে বসলেন।আমি থাকি ফাকে ফাকে।তাকে যেখান থেকে দেখা যায় সেখানে।আমার তখন ধুকপুক চলছে।যদি আর কথা না হয়...যদি আর দেখা না পাই... আস্তে আস্তে পুরস্কার দেয়াও শেষ হয়ে যায়।আমাদের কলেজ প্রথম আর সম্ভবত তাদের প্রজেক্টাই ২য় হয়।একসময় তারা বের হয়ে যাবেন বুঝতে পারছি।তখন স্কাউটদের গলার স্কার্ফটা খুলে আমি দৌড় আবার।কারণ তখনও স্কাউটদের অডি ছাড়তে বলা হয় নাই।কিসের নিয়ম নির্দেশ...আমি তো তখন দিশেহারা...যখন সিড়ি দিয়ে নামছেন তিনি তখন কথা হলো।কেমন যেন মিটিমিটি একটা হাসি।আমি আবার হার্টবিট মিস করলাম।চলে যাচ্ছেন।কি করবো,শুধু তাদের কলেজের গাড়ির সামনে দিয়ে হাটাহাটি করছি।কি করা যায়।হঠাত বুদ্ধি পেলাম।বনিকে ধরলাম,মামা,তোরে এক প্যাকেটে সিগারেট এখনি দিমু।এই নাম্বারটা দিয়া আয়।কত কষ্টে যে একটুকরা কাগজ আর কলম পাইলাম। লিখে দিলাম নাম্বার আর নিচে বাবু(আমার নাম)।এরপরে আস্তে আস্তে তাদের গাড়ি ভরে উঠলো।চলে গেলো।তখনি কেমন যেন খালি খালি লাগছিলো......তারপরেও শান্তনা ছিলো অন্তত নাম্বার দিতে পেরেছি।

এরপরে একটু একটু মন খারাপ নিয়া বাসার দিকে গেলাম।গিয়ে নাহিদকে কল করলাম(যার বাসায় থাকছি)।বললাম আমি শাহ আলীতে পুল ক্লাবে।ও বললো ওর একটু দেরী হবে।আমি যেন ওয়েট করি। আমি গেলাম।কয়েকজনের সাথে আড্ডা দিচ্ছি।হুট করেই মোবাইলে দেখলাম অনেকক্ষণ আগে আসা একটা মেসেজ বক্স এর সিগন্যাল।ওপেন করলাম। লেখাছিলঃ babu,ami Tammi.amar to mobile nei.tomar Jodi TnT number thake tahol ei number a msg dio.ami call korbo. আমি তো কিছুই বুঝলাম না(কত্ত গাধা ছিলাম)। নাহিদ আসলো।অনেকক্ষণ খেললাম বিলিয়ার্ড।রাতে বাইরেই খেলাম।তারপরে সারারাত কার্ড খেল্লাম।কেন যেন তার কথা মনে ছিলো না।হয়তো অবচেতন মন ভেবেছিলো হয়তো আর কখনোই তার সাথে দেখা হবে না,কথা হবে না,চশমা পরা চোখের ফাকে দেখবো না দুষ্ট হাসির ঝিলিক...

সকালে ঘুম থেকে ঊঠতে পারি নি।মোবাইলে চেক করতে গিয়ে আবার দেখলাম মেসেজটা।কেমন অদ্ভুত!!!তাম্মি কে?আমার নাম জানে,আমি চিনি না!!!!কি আজিব!!!নাহিদকে ডেকে উঠালাম।কোচিং ছিলো প্লেন মসজিদে।বাসে উঠলাম।প্রথমে ফার্মগেট তারপরে এলিফ্যান্ট রোড। বিআরটিসির ডাবল ডেকারে উঠলাম।দুপুর তখন।উপরে পুরাই খালি।আমি আর নাহিদ,হয়তো আরো দুই একজন ছিলো।হুট করেই আমার মাথায় কি যেন ক্লিক করলো।আরি!!!!!কাল না একটা মেয়েকে আমি নাম্বার দিলাম!!!!সাথে সাথে মোবাইল বের করে মেসেজ পাঠানোর সময়টা দেখলাম।মিলে যাচ্ছে।সন্ধ্যার কিছু আগে পাঠানো।বাসের মধ্যেই আমি বিশাল কইরা একখান চিৎকার দিলাম।নাহিদ জিজ্ঞেস করলো ঘটনা কি।ওরে বললাম।তারপরে পুরা ঘটনা বোঝা গেলো।বাস থেকে নেমেই কার্ড কিনলাম।কল করলাম মেসেজ পাঠানো হয়েছে যে নাম্বার থেকে সেই নাম্বারে।আমতা আমতা করে বললাম,আমার নাম বাবু।কাল তাম্মি আমাকে এই নাম্বার থেকে মেসেজ পাঠিয়েছে।ওর টিএন্ডটি নাম্বারটা দেয়া যাবে কিনা।ওপাশ থেকে বলা হলো,তিনি তাম্মির সাথে জিজ্ঞেস করে নেবেন।আমি যেন পরের দিন কল করি।আমি তো কথা বলার শেষে দুইটা লাফ দিলাম বিশাল বিশাল...

এরপরে তাম্মি নিজেই কল করলো।কথা হলো।তার নাম্বার নিলাম।কথা হলো।অনেক কথা...অনেকক্ষন...আমি পাগল হয়ে উঠেছি দেখা করার জন্য।স্থান সময় ঠিক হলো।বেইলী রোডের গলপিয়াতে দেখা হবে। আমি হরাইযন দাড়িয়েছিলাম...কলেজ ড্রেসে।তিনি আস্লেন,রিকশা থেকে নাম্লেন।তারপরে ছোট্ট করে একটা চিতকার,ইউনিফর্মে কেন??এখনো হাসি মনে হলে...

কথা বল্লাম...কথা হলো...অনেকক্ষণ গলপিয়াতে বস্লাম।যাওয়ার সময় হলো।রিকশা ঠিক করে দিলাম...একা একা চলে গেলো বাই বলে...আমাকে বললোও না যে আমি কোথায় যাবো/ওর সাথে রিকশায় উঠবো কিনা কারণ আমি মগবাজার যাবো বাস ধরতে।ওর বাসার রাস্তাতেই।চলে গেলো রিকশার হুড তুলে দিয়ে...আমি আবার একা।দাড়িয়ে থাকলাম।কিছুক্ষণ।একা একা।খুব একা...

সময়:সাল ২০১১..
স্থানঃশাহবাগ,জাদুঘরের সামনে।

আমিঃতুমি কই?
সেঃ আমি ল্যাব থেকে বের হইছি।কোথায় তুমি?
আমিঃআমি শাহবাগে।আসিফভাইর জন্য যে সমাবেশ করছি ওইখানে।
সেঃআমি আসবো?
আমিঃআসো।এসে চলে যাও।দেখা করে।

কিছুক্ষণ পরে  তিনি আসলেন।এসে ডাক দিলেন।আমি  তখণ ব্যস্ত কথা বলায় আন্দোলনের  পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে।আমি গেলাম।গিয়ে একটু করে হাতটা ধরলাম।বললাম,চলো,চা খাই।চা খেলাম।পরে বললাম,তুমি চলে যাও।এখানে তোমার থাকা লাগবে না।বললো,কিচ্ছু হবে না,থাকি।আমি জোর করে পাঠিয়ে দিলাম বাসায়।আমাকে বলে গেলো সাবধানে থাক্তে।আমি বললাম,থাকবো।

আবার আমি ব্যস্ত ও চলে যেতেই।খেয়াল নেই কোনদিকেই।হুট করেই মোবাইল বের করে দেখি ৮৭টা মিসকল।মোবাইল সাইলেন্ট ছিলো।টের পাইনি।আম্মু,আব্বু,আপু,তিনি...সবাই কল করেছেন।দেখতে দেখতেই আবার তার কল।রিসিভ করলা।উদ্বিগ্ন একটা কন্ঠ...খুব রাগের সাথেই বললো,কই তুমি?কল পিক করো না কেন?সবাই টেনশন করতেছে বাসায়...আমি বললাম,সাইলেন্ট ছিলো।টের পাই নাই।সর‍্যি। এরপর বাসায় কথা বললাম।তারপরে আবার ওর সাথে...

এই হচ্ছে ও আর আমি।তাম্মি আর আমি।সেই ২০০৫ এর গলপিয়া থেকে যে একদিন চলে গিয়েছিলো একা সে এখন আমার সাথেই।প্রতিটা সময় যে সাথে থাকে।এই ভালোবাসা,এই ঝগড়া।একদিন হুট করে হাত ধরে ফেলেছিলাম।কিছু না বলেই।সেই হাত এখন আমার হাত ধরে।আমাকে টেনে নেয়...২০০৫ থেকে ২০১১।এখন সে আমার।রাত পার করে দেই কথা বলে...তবুও যেন তার কথা শেষ হয় না।আমি অবাক হয়ে থাকি।আমার মত একটা কাঠখোট্টা ছেলের সাথে কেউ এভাবে কথা বলতে পারে?যখন হাসে,অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি।চশমার ভেতর থেকেও যেন তার চোখ কথা বলে আমার সাথে...অসম্ভব প্রিয় ওর চুল আমার।পাগল হয়ে থাকি...কখন ওর চুল ছুতে পারবো...

৬বছর পার হয়ে গেছে...ওর আর আমার।যেদিন ও মেসেজ দিয়েছিলো,জাতীয় সঙ্গীতের ২য় লাইন শুধুই আমার জন্য,পাগলে হয়ে ওকে কল করেছিলাম।শুধু ওর মুখ থেকে শোনার জন্য।বলে নি।শুধু বলেছিলো,মেসেজতো দিয়েছি।বলাতে পারি নি।শুনতে পারি নি,সেই আকাংখিত কথাটি।দেখা হতো না।কথা হতো না।দুইজনেরই পরীক্ষা।তারপরে ইন্টার পাশ করে দুইজনের ভার্সিটি...আর ও আর আমি।

খুব রাগ হয় আমার কাজকর্মে।আমি নাকি খালি দেশ  দেশ করি।কি হবে এসব করে।কেন  ওকে সময় দেই না।কেন মিছিলে থাকি,কেন মিটিং এ থাকি।অনেক  অভিযোগ।অভিযোগ আর অভিযোগ...  জানি কিসের ভয় থেকে বলে  এসব।বলাটাই স্বাভাবিক।আমিও শুনিনা ওর কথা।জানি দুইদিন পরে আবার ওই আমাকে বলবে এইটা নিয়ে লেখ,ওইটা নিয়ে কাজ  করা উচিত।নিজেই আবার আমাকে বলবে।

আমাদের গল্পটা খুব সাধারণ।কিন্তু আমার চোখে প্রতিটা সময় ধরা  আছে।প্রতিটা সেকেন্ড।প্রতিটা সময় এখনো দেখতে পাই।সবচেয়ে মজার ছিলো মিরপুর থেকে বাসা চেঞ্জ করে যখন মগবাজারে আসলাম,তখন হুট করেই গলিতে ঢোকার মুখ দেখি ডাক্তারের গলি লেখা।আমি তো অবাক।এক পরিচিতকে বলে দিয়েছিলাম বাসা খুজতে।তিনি এই গলিতেই বাসা দেখেছেন।যখন বাসা ঠিকাঠাক হলো তখন বললাম আমরা ডাক্তারের গলিতে বাসা নিয়েছি।ও তো অবাক।কারণ হুট করেই বাসা চেঞ্জ করেছিলাম।ও বললো কোথায়?আমি বললাম,মসজিদের সাম্নের গলিতে।তখন ফুটবল বিশ্বকাপ চলে।২০০৬।আমি বল্লাম,আমি আমাদের বাসার ছাদে।ওর ছোট ভাই আবার ফ্রান্সের সাপোর্টার।বললো দেখো তো কোন বাসার ছাদে ফ্রান্সে পতাকা দেখা যায় কিনা।খুজতে খুজতে দেখি ঠিক রাস্তার অপর পাশেই মাত্র ৯টা বিল্ডিং পরেই একটা বাসার ছাদে ফ্রান্সের পতাকা।বিল্ডিঙ এর বর্ণনা দিতে তিনি উচ্ছসিত কন্ঠে জানালেন,হ্যা।এইটা।আমি চিন্তা করলাম,এই ছিলো কপালে?হুহ...এখন তিনি মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করে বলেন,"তাজিম(ওর ছোট ভাই)কে পাঠাইছি।আচার খাইতে ইচ্ছা করতেছে।প্রান এর আমস্বত্ত।কিনে পাঠাও..." আমি আবারো চিন্তা করি..."হায়রে আল্লাহ!!!!এই ছিলো কপালে????"


-Babu Ahmed